এক চিমটি গুলতেকিন এবং ডুব

0
379

এক:

গুলতেকিন খান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন একটি গাছের নিচে। পড়নে হালকা গোলাপি রংয়ের শাড়ি এবং হাতে কলম। বাতাসে তাঁর চুলগুলো উড়ে কপালে পড়ছে। তিনি খুব যত্ন করে হাত নিয়ে চুল গুলো সরিয়ে দিচ্ছেন।

সময়টা ২০১৬ একুশে বইমেলা, দূর থেকে গুলতেকিন খানকে দেখে চিন্তা করলাম কাছে যাব কিনা। দেখলাম খুব একটা ভিড় নেই। গুলতেকিন খানের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম কেমন আছেন তিনি?

উত্তরে তিনি বলেন, জ্বি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?

একজন অচেনা মানুষের সাথে এতে সুন্দর করে কথা বলতে আমি খুব কম মানুষকে দেখেছি। কথা বলার মধ‍্যেই যেন একটা মায়া আছে ওনার।

আমি বললাম, জ্বি ভালো আছি। একটা অটোগ্রাফ দেয়া যাবে।

তিনি বললেন, কেন নয়। অবশ‍্যই।

এরপর আমি বইটা এগিয়ে দিলাম, ওনি অট্রোগ্রাফ দিতে দিতে জানতে চাইলেন আমি কোথা থেকে এসেছি। খুব আগ্রহ নিয়ে বললাম, একটু আগে হুমায়ূন স‍্যারের অনিল বাগচির একদিন মুভি দেখেছি। এরপর ঘুরতে এলাম মেলায়।

গুলতেকিন খান বললেন, কেমন লেগেছে মুভিটা?

আমি বললাম, স‍্যারকে মিস করেছি পুরো মুভিতে। স‍্যার পরিচালনা করলে আরো ভালো হতো।

আমার দিকে তাঁকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। আমি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা আপনি নিয়মিত লিখবেন? স‍্যারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ মূলক কিছু কিংবা কোন গল্প, উপন‍্যাস।

ওনি বলেন, না খুব একটা নিয়মিত লিখব বলে মনে হয় না। তবে কবিতা লিখতে পছন্দ করি। হয়ত টুকটাক কবিতা লিখতে পারি।

তারপর ওনার সাথে বেশ খানিকক্ষণ কথা বলে একত্রে ছবি তুলে বিদায় নিলাম।

আরো পড়তে পারেন: আমি এবং একজন আয়না

বসেছিলাম ডুব সিনেমার রিভিউ লিখতে। তবে অনলাইনে এই মুভিটা নিয়ে এত রিভিউ লেখা হয়েছে ভাবলাম রিভিউ না লিখে আমার মনে কথাগুলো তুলে ধরি। তাই শুরু করলাম হুমায়ূন আহমেদ স‍্যারের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খানের সাথে আমার স্মৃতিচারণ দিয়ে। কেনই বা তা তুলে ধরেছি পুরো লেখাটি পড়লেই জানা যাবে।

দুই:

ডুব মুভি দেখা শুরু করার পরে জাভেদ হাসানের প্রথম স্ত্রী ‘মায়া’ চরিত্রে রোকেয়া প্রাচীকে যতবার দেখেছি আমার মনে হয়েছে পরিচালক খুব চেষ্টা করেছিলেন গুলতেকিন খানকে এই চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে। একজন শক্ত সাহসী মানুষ, যিনি সুন্দর করে কথা বলেন এবং যে কোন পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। যার রয়েছে সন্তান ও স্বামীর জন‍্য অফুরক্ত ভালোবাসা। তবে সেই ভালোবাসাগুলো তিনি প্রকাশ করতে পারেন না, রেখে দেন মনের গহীনে। পুরো মুভিটি দেখে  আমার মনে হয়েছে সম্পূর্ণ গুলতেকিন খানকে এই মুভিতে ফুটিয়ে তুলতে পারেনি পরিচালক।

তবে যতটুকু তুলে ধরেছেন তা মন্দ বলা যাবে না। জাভেদ হাসানের মরে যাওয়ার খবর শুনে মায়া বলেছিলো, তুমি মরে গেছো এটা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। কারণ এখন তোমার উপর কারোর অধিকার নেই। আমি চোখ বন্ধ করলেই তোমাকে দেখতে পাব।

আচ্ছা এটা তো কোন বায়োপিক নয়, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী অনেক বার বলেছেন এই কথা। তাহলে কেন মুভিটি দেখার সময় বার বার আমি হুমায়ূন আহমেদের ছায়া খুঁজে পেয়েছি। হয়ত মুভি নিয়ে এত বির্তক হওয়ার কারণেই। মুভিটি দেখার পরে শুধু আমি নয়, সবাই হুমায়ূন আহমেদের ছায়া খুঁজে পেয়েছেন। আচ্ছা সেই তর্কে না গিয়ে মুভিটি নিয়ে বলি।

ইদানিং মৃত্যু নিয়ে আমি প্রায় ভাবি। মাঝে মাঝে মনে হয় মরে গেলেই তো শেষ। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে গিনিপিক ছাড়া কিছুই নয় আমি বা আমরা। মৃত্যু নিয়ে যেন নতুন করে ভাবনার জগতে প্রবেশ করেছিলাম ডুব মুভিটা দেখার সময়। মুভির শুরুতেই জাভেদ হাসান তার মেয়ে সাবেরী(নুসরাত ইমরোজ তিশা) কে বলতেছিলো, মানুষ তখনই মারা যায়, যখন এই পৃথিবীর কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় কিংবা তার কাছে পৃথিবীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।

অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি দেখেছি ডুব মুভিটিতে। প্রতিটি চেনা দৃশ‍্যকে বেশ ভিন্নভাবে ফারুকি স্টাইলে তুলে ধরা হয়েছে। মুভির চরিত্রগুলোকে না দেখিয়ে অনেক দৃশ‍্যে শুধু স্টিল ছবি বা সাধারণ অবজেক্ট দেখিয়ে অনেক কিছু ফুটিয়ে তুলো হয়েছে। বিষয়টি অনেকেই কাছেই খারাপ লেগেছে তবে আমার কাছে চমৎকার লেগেছে।

সিনেমাটিতে প্রতিটি চরিত্রের আবেগ অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার জন‍্য ক‍্যামেরা দীর্ঘক্ষণ স্লো ভাবে চরিত্রগুলোর উপর ফোকাস করা ছিলো। যা অনেকের কাছে নাকি বিরক্ত লেগেছে। বিশেষ করে ফেইসবুকে মুভি বিষয়ে গ্রুপগুলোতে সবাই বিষয়টি নিযে বেশ সমালোচনা করেছেন। হ‍্যাঁ ওনারা সমালোচনা করতে পারেন, একজন দর্শক হিসেবে ওনার কাছে মুভিটি কেমন লেগেছে তা তিনি তুলে ধরতে পারেন। এটা যার যার ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার। তবে আমার কাছে বিষয়টি মন্দ লাগে নি। মনে হয়েছে চরিত্রগুলোর আবেগটুকু যেন দর্শকরা উপভোগ করতে পারে সেই সময়টুকু দিয়েছেন পরিচালক।

মুভিটিতে সংলাপ খুবই কম ছিল। কোন কোন দৃশ্য একটিমাত্র সংলাপে শেষ হয়েছে। ফলে দর্শকদের অনেক কিছু অনুমান ও চিন্তার একটা জায়গা ছিলো। ইরফান খান ভালো বাংলা বলতে পারে না। তবে মুভিটিতে পারিচালক বেশ কৌশল অবলম্বন করেছে। জাভেদ হাসানের বড় বড় ডায়ালগগুলো ইংরেজিতে দেয়া হয়েছে।

একটি দৃশ্যে দেখা যায়, সাবেরী দৌড়ে বাবা জাভেদ হাসানের জন‍্য পানি নিয়ে আসে। সাবেরী খুব চাচ্ছিলো বাবা পানি খেয়ে যেন বাড়িতে থেকে যায়। বাবা যেন বাড়ি ছেড়ে না চলে যায়। বাবাকে ঘরে রাখার শেষ এই চেষ্টা ব‍্যর্থ হয়। তখন সাবেরী যে কান্না সেটি দর্শকের মন ছুঁয়ে যাবেই। আনমনে কান্না আসতে চাইবে দর্শকদের।

সিনেমাটিতে ভালো লাগা একটি দৃশ্য ছিল মায়ের জন্মদিন পালনের জন্য আশুলিয়ায় সাবেরীর আয়োজন। সেখানে মাকে অবাক করে দিয়ে জন্মদিনের অভিনন্দন জানিয়েছে সাবেরী। ভাঙনের পর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর জন‍্য মাকে প্রসংশা করেন সাবেরী। কিন্তু মায়ের সামনে প্রসংশা না করে একটু দূরে গিয়ে ফোন করে মাকে মনের কথাগুলো জানায় সাবেরী।

পুরো দৃশ‍্যটি শেষ অংশে যখন মাকে সাবেরীকে জড়িয়ে ধরে তখন যেন আনমনে আমার চোখে জল এসেছিলো। বার বার আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। ২০১৪ সালে বাবার ক‍্যান্সার ধরা পড়েছিলো। তখন আমি অনেক ভেঙ্গে পড়েছিলাম। সেই সময় আম্মা বলেছিলেন, টেনশনের কিছু নেই। এত অল্পতে ভেঙ্গে পড়লে হবে। আল্লাহ ভরসা। আমরা আমাদের মত চেষ্টা করে যাব। বাকিটা আল্লাহ উপরে ছেড়ে দিলাম।

আম্মার কথায় আমি যেন শক্তি ফিরে পাই। বাবাকে নিয়ে শুরু হয়ে নতুন এক অধ‍্যায়। দুইটি বেশ বড় অপারেশন, রেডিও থেরাপি, কেমো থেরাপি পরে বাবা এখনো বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে। প্রতিদিন অফিস করে ঘরে ফিরে যখন দেখি বাবা-মা একত্রে সোফায় বসে গল্প করছেন তখন মন ভালো হয়ে যায়। মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

একটি সিনেমা দেখে যখন নিজের জীবনের ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়, চোখে জল আসতে চায় তখন আমি বলতে বাধ‍্য হব পরিচালক সার্থক। হয়ত অনেকে কাছে ভালো লাগেনি সিনেমাটি। একটি সিনেমা যে সবার কাছেই ভালো লাগতে হবে তা নয়। ভিন্ন রুচি ও মতামত থাকতেই পারে।

যারা মুভিটি এখনো দেখেন নি হলে গিয়ে দেখার অনুরোধ রইলো। একটু নতুন করে ভাবতে শেখাবে আপনাকে। সম্পর্কের গল্পগুলো এবং মায়াময় আবেগগুলো আপনাকে কিছু সময়ের জন‍্য সত‍্যি ডুবিয়ে রাখবে।

 

তিন:

এই মুভির কাহীনি সংক্ষেপ ট্রেইলার দেখেই সবাই বুঝে ফেলেছেন নিশ্চয়। তাই আর কাহীনি সংক্ষেপ না বলি। সিনেমাটি ২০১৭ দিয়ে শুরু হয়। এরপর ২০১০ এর একটি প্রেক্ষাপট। তারপর স্মৃতিচারণে ১৯৯০ এর ঘটনাও বর্নিত হতে থাকে।

মুভির যে বিষয়গুলোর আমার কাছে ভালো লাগেনি, জাভেদের দ্বিতীয় স্ত্রী নীতুকে পুরো দোষী দেখানো হয়েছে। এক দৃশ‍্য থেকে আরেক দৃশ‍্যে যাওয়া সময় মাঝে মাঝে মনে হয়েছে কিছু একটা মিসিং ছিলো। পুরো মুভি জুড়ে একবারও মনে হয়নি নিতুকে ভালোবাসেন জাভেদ বা তার মাঝে আশ্রয় খুঁজছেন। হয়ত বিষয়গুলো পরিচালক আরেকটু গুছিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারতো। জাভেদের ব‍্যকগ্রাউড হিস্টোরি যদি আরেকটু ফুটিয়ে তুলতো তাহলে মন্দ হতো না। অনেক দর্শক বুঝতেই পারেনি জাভেদ কিভাবে মারা গেছে। হল থেকে বের হওয়ার সময় শুনেছি অনেক দর্শক বলাবলি করছেন, জাভেদ হাসান কিভাবে মারা গেছেন?

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের দিক দিয়ে ডুবকে আমি এগিয়ে রাখব। আহারে জীবনের সুরে টালমাটাল হয়ে ছিলো পুরো সিনেমা জুড়ে। মাঝে মাঝে এক নৈশব্দতা আক্রমণ করেছিলো আমাকে। আবার চিরকুটের ‘আহারে জীবন’ গানটি কানে স্বস্তি এনে দিয়েছিলো। গানটি শুনে সেই সাথে চমৎকার লাইনগুলোতে হারিয়ে ডুবে গিয়েছিলাম ভাবনার জগতে ।

এক নজরে ছবিটি তথ‍্য:
পরিচালক: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
নাম ভূমিকায়: ইরফান খান (ভারত), রোকেয়া প্রাচী, নূসরাত ইমরোজ তিশা ও পার্ণো মিত্র (ভারত)
ব্যানার: জাজ মাল্টিমিডিয়া ও এসকে মুভিজ
রিলিজ তারিখ: ২৭ অক্টোবর, শুক্রবার