হোয়াইটবোর্ডে লেখা নাম : আহারে জীবন

0
74

এক:

সকালে ঘুম থেকে উঠেই অনেক বেশি ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে। রাতে চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখলাম। এই স্বপ্নের রেশ যেন কাটছে না। স্বপ্নে দেখলাম ইন্দ্রাণীর হাত ধরে সমুদ্রের পারে হেঁটে বেড়াচ্ছি। সন্ধ্যা নামবে, সমুদ্রপারে আমি আর ইন্দ্রাণী। একটু পর পর গর্জন করে ছুটে আসছে সমুদ্রের ঢেউ। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে ঝিরঝির বাতাস ইন্দ্রাণীর চুলগুলো উড়িয়ে নিচ্ছে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। মেয়েটাতে যত দেখছি ততো যেন অদ্ভুত মায়া কাজ করছে। ছেড়ে যেতেই ইচ্ছা করে না। ইন্দ্রাণীর হাত ধরার পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লাগে। সম্পূর্ণ হাত না ধরে ওর আঙ্গুল দিয়ে আমার আঙ্গুলগুলো আলতো করে ধরে রাখে। এই আলতো ছোঁয়ার অনুভূতিগুলো যেন স্বপ্নে সত্যি সত্যি পেয়েছিলাম।

চোখ বন্ধ করে স্বপ্নের কথা ভাবতেছি এমন সময় হঠান শব্দ পেলাম আম্মা ডাকছে, এই রঞ্জু তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠ। আজকে হাসপাতালে যেতে হবে মনে আছে তো?

হুম আম্মা মনে আছে উঠছি।

দুই:

হাসপাতালে এসে আমার নির্ধারিত কেবিনের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। গত ২ বছর ধরেই এই কেবিনে আসা হচ্ছে। তাই  কেবিনটি যেন আমার দ্বিতীয় ঘর হয়ে উঠেছে। কেবিনের জানাল দিয়ে রাস্তার কিছু অংশ দেখা যায়। রাতের বেলা যখন লাইট জ্বালিয়ে গাড়িগুলো চলতে শুরু করে তখন আমি বেশ মজা করে কেবিনের বিছানায় শুয়ে তা দেখি। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাত যত গভীর হয় গাড়ির পরিমাণ ততো কমতে থাকে। আবার সকাল থেকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে গাড়ির পরিমাণ বাড়তে থাকে। শুরু হয় ব্যস্ত নগরজীবনের যাত্রা।

কিন্তু আমি ব্যস্ত নগরজীবনে অলসের মতই বিছানায় শুয়ে থাকি। একটা সময় আমি অনেক বেশি ব্যস্ত থাকতাম। পড়াশুনার পাশাপাশি করতাম পার্টটাইম চাকরি। নিজের জন্য সময় থাকতো না, সারা দিন থাকতাম হতো দৌড়ের মধ্যে। তখন মনে হতো আহারে যদি টানা কয়েকদিন বিছানায় আরাম করে কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু এখন দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হলেও তা আর ভালো লাগে না। দিন দিন আমার অসহ্য মনে হচ্ছে সব কিছু। খুব বেশি মিস করি আমার ব্যস্ত সময় গুলোকে।

পাঠক এখন নিশ্চয় আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে আমি কেন হাসপাতালে আসতে হয় আমাকে? উত্তরটা দিচ্ছি, সপ্তাহে তিনদিন আমার শরীর থেকে রক্ত বের করা হয়। তারপর সেই রক্তগুলো পরিশোধিত করে আবার আমার শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এই প্রক্রিয়ার নাম হলো ডায়ালাইসিস। হ্যাঁ আপনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন আমার কিডনি জনিত সমস্যা রয়েছে। শুধু সমস্যা বললে তা ভুল হবে। এটাকে বলা যায় মহাসমস‍্যা। কেননা আমার দুইটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তো অনেক বন্ধুরা বলে আমি নাকি ‘কিডনি রঞ্জু’।

গত দুই বছর ধরে রঞ্জু আহমেদ থেকে পরিবর্তন হয়ে আমার নাম হয়ে গেছে কিডনি রঞ্জু। আমি চেষ্টা করি অসুখটার কথা ভুলে থাকতে। কিন্তু কিছু বন্ধু যখন কিডনি রঞ্জু বলে ডাকে তখন আমার অসুখের কথাটা বহুগুণ মনে পরে যায়। তখন মন খারাপ হয়, বুক ফেটে কান্না আসতে চায়। ইচ্ছা করে হাউকাউ করে কাঁদি আর বলতে ইচ্ছা করে, এত দ্রুত সুন্দর পৃথিবী থেকে যেতে চাই না।

তবে বন্ধুদের সামনে নিজের খারাপ লাগাটুকু লুকিয়ে হাসিমুখে কথা বলা শিখে গেছি। প্রথম কয়েকটা মাসে বেশ কষ্ট হয়েছিলো প্রায় কেঁদেই ফেলতাম। কিন্তু সময় যত যাচ্ছে আমি যেন খারাপ লাগাটুকু লুকিয়ে রাখার পাক্কা অভিনেতা হয়ে যাচ্ছি। বন্ধুরা তা ধরতেও পারে না।

আচ্ছা আমার কিডনিতে সমস্যা তাই কি আমার নাম পরিবর্তন করে কিডনি রঞ্জু ডাকতে হবে? আমার অসুখ নিয়ে কেন মজা করবে? সত্যি কি অসুখ নিয়ে মজা করা যায়? তাদের কি একবারও মনে হয় না আমার কতটা খারাপ লাগতে পারে? হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে শুয়ে এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানা নেই। আম্মা এসে ওষুধ খাওয়ার জন্য যখন ডাকলো তখন ঘড়ি দিকে তাকিয়ে দেখি সময় দুপুর ২টা। কিছুক্ষণ পর যেতে হবে ডায়ালাইসিস রুমে।

এখন আমি ডায়ালাইসিস রুমে। এই রুমে একত্রে কয়েকজনকে ডায়ালাইসিস করানো হয়। আমার পাশের বেডে আজকে শুয়েছেন আফসানা আন্টি। ওনার বয়স ৪০ বছরের মত। তবে দেখলে মনে হয় খুব বেশি হলে বয়স ২৮-২৯ বছর হবে। আন্টির চেহারার সাথে সুচিত্রা সেনের বেশ মিল রয়েছে।

কয়েকদিন আগে ডায়ালাইসিসের করানোর সময় আমাকে আন্টির ওনার স্কুলে জীবনের গল্প বলতেছিলো। এমনভাবে বলল যেন আমি আন্টির স্কুল জীবনের বন্ধু।

আন্টি বলল, রঞ্জু তুই কোনদিন প্রেম করেছিস?

আমি একটু লাজুক মুখ করে বললাম, না মানে আন্টি ছিলো একটা প্রেম। কিন্তু তা আর স্থায়ী হয় নাই।

আন্টি বলল, জানিস রঞ্জু যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন আমাদের এলাকায় একটা ছেলে প্রেম পত্র দিয়েছিলো আমাকে। এটাই ছিলো আমার জীবনের প্রথম প্রেম পত্র। চিঠিটা ছিলো এমন, “আফসানা সাহস করে আজকে তোমাকে চিঠি দিলাম। জানি না এরপর আর আমাকে দেখবে কিনা। লজ্জা লাগছে খুব তবুও লজ্জা জয় করে জানিয়ে দিচ্ছি। তোমাকে আমার ভালো লাগে। তোমার সাথে সারা জীবন থাকতে কাটিয়ে দিতে আমার অসুবিধা হবে না। আশা কি তোমারও হবে না। তুমি রাজি থাকলে আমি তোমার সামনে আসব। না হলে আর কোন দিন আসব না”

কিন্তু কি আজব, কিভাবে আমি ছেলেটাকে জানাব আমারও তার সাথে সারা জীবন থাকতে অসুবিধা নেই। উত্তর জানানো কোন উপায় জানানো ছিলো না চিঠিতে। ছেলেটাকে আর এলাকায় দেখিনি আমি। আসফোস তখন আমাকে প্রথম প্রেম পত্র পাঠানো মানুষটিকে আর পেলাম না।

আমি বললাম, আন্টি আক্কেল কি জানে এটা?

রঞ্জু মজার কথা কি জানিস? আগে ভাবতাম মীরাক্কেল বা কাকতালীয় বিষয়গুলো শুধু মুভিতে হয়। কিন্তু আমার জীবনে যে এমন মীরাক্কেল হবে তা আমি বুঝতে পারিনি বা চিন্তাও করেনি।

কৌতূহল মনে আমি প্রশ্ন করলাম, তাই নাকি? কি হয়েছিলো?

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে আমার বিয়ে ঠিক হলো। খুব মন খারাপ করে বিয়েতে রাজি হলাম। বাসর রাতে তোর আক্কেল জানালো ওনি সেই ব্যক্তি যে প্রথম প্রেম পত্র দিয়ে ছিলো আমাকে। প্রায় ৬ বছরের ওর চেহারার অনেক পরিবর্তন হয়েছে তাই আমিও চিনতে পারিনি।

আমি বললাম, বাহ আন্টি এই তো দেখি কঠিন প্রেমকাহিনী।

আন্টি আমার দিকে মুচকি করে হেসে বলে আসলেই তাই। আমি যদি কোন বড় লেখক হতাম তাহলে এই কাহিনী নিয়ে একটা বই লিখতাম।

তিন:

আজকে আমার পাশের বেডে শুয়ে থাকা হাসিখুশি চেহারা আফসানা আন্টিকে কেমন মন মরা মনে হচ্ছিলো। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল ওনার। এর মধ্যে চলছে ডায়ালাইসিস।

আন্টি বলল, কিরে রঞ্জু কি অবস্থা কেমন আছিস।
জি আন্টি ভালো আছি। আপনার কি অবস্থা।
আন্টি বলল, নারে আমার অবস্থা খুব একটা সুবিধার না। আজকে নিশ্বাস নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে।
আল্লাহ ভরসা আন্টি দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন।

আমার ঘুম পাচ্ছে। ইদানীং শরীর বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। একটু শুয়ে থাকলেই ঘুম চলে আসে।

হঠাৎ নার্সের শব্দের ঘুম ভেঙ্গে। নার্সরা দৌড়াদৌড়ি করছে। ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছে। পাশে বেডে শুয়ে থাকা আফসানা আন্টিও দেখি ঘুমাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে দ্রুত ছুটে এলো একজন ডাক্তার। আফসানা আন্টিকে চেক করে নার্সদের বলল, ওনি আর নেই। মারা গেছেন।

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। একটু আগে এই মানুষটার সাথে আমার কথা হলো। আগেও মরে যাওয়া মানুষ দেখেছি কিন্তু এত কাছ থেকে কখনো দেখিনি। মাত্র এক ঘণ্টা আগে যিনি কথা বলল তিন এখন নেই। কি অদ্ভুত। জীবন কতটা ক্ষণস্থায়ী…

বিছানায় শুয়ে দেখলাম ডায়ালাইসিসি রুমে থাকা সাদা হোয়াইটবোর্ড থেকে আফসানা রহমান নামটি একজন নার্স মুছে দিলো। হোয়াইটবোর্ডে অনেকেরই নাম লেখা ছিলো। দিনে দিনে তা কমেও যাচ্ছে। আজও একজন কমলো তারপর…..অপেক্ষা প্রহর হয়ত শুরু আমার…..