উইমেন চ্যাপ্টার এবং অত:পর আমরা

0
438

আমার ভাগ্নি নাবিহা ক্লাস ওয়ানে পড়ে। হিন্দি কার্টুন দেখতে দেখতে হিন্দি ভাষাটা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন তিনি। কথায় কথায় তিনি হিন্দি বলেন। যা আমার খুবই বিরক্ত লাগে। একদিন খুব রাগ করে ওনাকে বকা দিলাম। তারপর ওনি আমার উপর অনেক রাগ করে কয়েকদিন কথা বলেনি।

এর ঠিক দুইমাস পর আবার মামার বাড়িতে বেড়াতে আসে নাবিহা। এরপরও লক্ষ্য করলাম কথায় কথায় হিন্দি বলা কমেনি। এবার আমি নাবিহাকে ডেকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম। কেন হিন্দি বলা এভাবে ঠিক না?

আমি বুঝানোর সময় আমাকে পাল্টা অনেকগুলো প্রশ্ন করলো সে। আমি না রেগে, না বকা দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় প্রশ্নের উত্তর ও বিষয়টা বুঝিয়ে বলি নাবিহাকে।

এরপর কয়েক মাস পরে যথারীতি স্কুল ছুটিতে নাবিহা বেড়াতে এলো মামার বাড়ি। অবাক করা ব্যাপার এবার সে আগের মত হিন্দি ভাষায় কথা বলছে না।

এই ঘটনার পরে আমি বুঝতে পারলাম বকাবকি বা গালিগালাজ করে কোন লাভ নেই। বাচ্চাদের বুঝাতে হবে যুক্তি দিয়ে এবং ঠাণ্ডা মাথায়। বড়দের তুলনায় যুক্তি বাচ্চারা খুব সহজেই বুঝতে পারে বলে আমার ধারণা।

বড়রা যে যুক্তি না বুঝে সুন্দর করে না বুঝিয়ে গালিগালাজ বা বকাবকি করতে পারে তা উইমেন চ্যাপ্টার নামক একটি ব্লগ সাইট নিয়ে সম্প্রতি কার্যক্রম থেকে বুঝতে পারলাম।

এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণ ১০০ শতাংশ ভালো এমন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নেই। একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ভালো খারাপ দুই গুনই থাকতে পারে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আমাদের উচিত ভালো কাজগুলো প্রশংসা করা। আর খারাপ কাজগুলো যুক্তি সহকারে তুলে ধরা কিংবা বুঝিয়ে বলা।

মনে রাখতে হবে যাকে বুঝাবো সে যেন আঘাত না পায়। তাহলে বাচ্চাদের মতই ব্যাপারটি তার কাছে নেগেটিভ ভাবে যাবে। আমরা যদি সুন্দর ভাষা ব্যবহার করে কথা বলি এবং যুক্তি দেই তাহলে অবশ্যই অপর পক্ষ তা বুঝতে পারে। হয়ত প্রথমবার নাও বুঝতে পারে কিন্তু একটি সময় ঠিকই বুঝতে পারবেন।

সম্প্রতি সময়ে দেখেছি নারী বিষয়ক অনলাইন পোর্টাল উইমেন চ্যাপ্টার নারীদের সচেতনতা মূলক বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত করছে নিয়মিত। এই লেখাগুলো একজন নারীর জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আমি প্রশংসা করি উইমেনচাপ্টারের এই উদ্যোগ ও লেখাগুলোর।

কিন্তু এই লেখাগুলোর অনেক শিরোনাম আমার কাছে অশ্লীল ও ক্লিকবাজ মনে হয়েছে। আমি প্রশংসা করি তাদের লেখাগুলোকে কিন্তু ক্লিকবাজ টাইপের অশ্লীল শিরোনামগুলো ভালো লাগেনি। চাইলে আরও সুন্দর রুচিশীল শিরোনাম দেয়া যেত।

কিছু মানুষ উইমেন চ্যাপ্টারকে আগে থেকেই গালাগালি করতো। নারীবাদী বলে তাদের লেখাগুলো পুরুষদের খারাপভাবে উপস্থাপন করছে এরূপ নানা সমালোচনা হয়েছে। কেউ কেউ উইমেন চ্যাপ্টারের নারী লেখিকাদের বেশ অশ্লীলভাষায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গালিগালাজও করেছেন।

আপনারা গালিগালাজ না করে ভদ্র ও সুন্দর ভাষায় যুক্তি সহকারে যে মতামতগুলো সাথে আপনি একমত নয় তা বুঝিয়ে তুলে ধরতে পারতেন। এতে করে সুন্দর আলোচনার জায়গা তৈরি হতো।

সম্প্রতি উইমেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক সুপ্রীতি ধরের ‘গৃহকর্মিরা যখন গৃহকর্ত্রী হতে চায়
শিরোনামে একটি লেখাকে কেন্দ্রে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় শুরু হয়েছে। কেউ সুপ্রীতি ধরের পক্ষে কেউ বা বিপক্ষে।

স্যোসাল মিডিয়াতে এই ইস্যু অনেকবার হোম পেইজে আসার পরে আমি আগ্রহ নিয়ে লেখাটি পড়লাম। সম্পূর্ণ লেখায় কিছু অংশ আমার নিজেও ভালো লাগে নি। তবে কিছু কিছু অংশ ভালো লেগেছে। যদি আরেকটু সুন্দর ভাষায় কোন কর্মজীবী শিশুকে বা তার কাজকে ছোট না করে লিখতো তাহলে মনে হয় লেখাটি আরও বেশি পাঠক প্রিয়তা পেতো এবং এত সমালোচনার সৃষ্টি হতো না।

মূলত পৃথিবীতে বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ধরনের। হয়ত আমার যা পছন্দ তা অন্য কাউও পছন্দ না। ভিন্ন মতামত থাকতে পারে। আর এই ভিন্ন আছে বলেই তো পৃথিবীটা এত সুন্দর। ভিন্ন মৌসুম আছে বলেই শীত আমাদের পছন্দ কিংবা বর্ষা আমাদের পছন্দ। আমরা যদি ভিন্ন মতামতগুলোকে শ্রদ্ধা করে নিজেদের মতামত প্রকাশ করি তাহলে কিন্তু সমস্যা নেই।

কিছুক্ষণ আগে সুপ্রীতি ধরের ফেইসবুকের স্ট্যাটাসে দেখলাম উইমেনচাপ্টার কয়েকবার হ্যাকের চেষ্টা করেছে এবং সাইট বর্তমানে ডাউন হয়ে আছে। ব্যাপারটি এমন হয়ে গেলো আমাদের বিপক্ষে কেউ বললেই রক্ষা নেই। এভাবে যে কোন বিষয়ের ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে আসুন না আমরা সুন্দরভাবে আলোচনা করি। যুক্তি দিয়ে কথা বলি। সুন্দর করে বকাবকি গালিগালাজ না করে মতামত জানাই।

তাহলে দেখবেন একদিন নাবিহার মত সবাই তাদের বদ অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করে ফেলবে। সুন্দর মতামত এবং ব্যবহার ও একটু শ্রদ্ধা আমাদের সমাজকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। একটু একটু করে পরিবর্তন হলে ক্ষতি কি?