মধ্যবিত্ত এবং বইমেলা

0
34

এক
রঞ্জু ক্লাস সেভেনে পড়ে। সারা বছর ধরে মাটির ব্যাংকে টাকা জমালো। উদ্দেশ্য অনেকগুলো টাকা হলে সে এবার বইমেলায় যাবে। এই জীবনে  কখনো সে বইমেলায় যায়নি। তাই গত বছর থেকে মাটির ব্যাংক টাকা জমানো শুরু করে। মাটির ব্যাংক থেকে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়ে বইমেলা যাবে এবং বই কিনবে।

ক্লাস ৪ থেকে রঞ্জু বাবাকে প্রতিবছর বইমেলায়  নিয়ে যাওয়া কথা বলে। কিন্তু বাবা নিয়ে যায় না। বাবার ইচ্ছা থাকলে বইমেলায় নিয়ে যেতে পারবে না। কেননা  প্রতি মাসের শেষে বাবাকে হাজার খানেক টাকা ধার করতে হয় সংসার চালাতে গিয়ে।এই বেতনে সরকারি চাকরি করে পুরো একটি যৌথ পরিবার চালানো সহজ ব্যাপার নয়। তাই মাটির ব্যাংকটি এই বছর বইমেলা যাওয়া ভরসা।

রঞ্জু খুব ভালো করে বুঝতে পারে। বাবারও ইচ্ছা হয় সন্তানের সব চাহিদা পূরণ করতে। কিন্তু সামর্থ্য না থাকায় পারে না। এই নিয়ে রঞ্জু বাবা-মাকে কখনো প্রেশার দেয় না।

গত বছর রঞ্জু যখন ক্লাস সিক্সে পড়ে তখন বইমেলার সময়  রঞ্জু বাবাকে বলল, বাবা মেলায় যাব। বাবার উত্তর,আচ্ছা দেখি বিশ তারিখের পরে নিয়ে যেতে পারি কিনা।

বিশ তারিখ হলো। রাতে অফিস থেকে বাবা বাসায় ফিরলো। রঞ্জু  কিছুটা মন খারাপ বলে বাবাকে বলে, বাবা বই মেলায় কবে যাব?

বাবা হাসি মুখে তার ব্যাগ থেকে একটি মাটির ব্যাংক বের করে বলে, এই নে রঞ্জু মাটির ব্যাংক। এই বছর থেকে টাকা জমানো শুরু কর।প্রতিদিন  তুই যখন যা পারবি তা ফেলবি এই ব্যাংকে। আমিও ফেলব। তারপর যে টাকা হবে সেগুলো দিয়ে আগামী বছর আমরা মেলায় যাব।

রঞ্জু মন খারাপ হয়ে গেল। চোখ দিয়ে পানি চলে আসতে চাইলো।রঞ্জুর খুব ইচ্ছা করছে এখুনি বাবার সামনে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলতে। কিন্তু বাবার সামনে কান্না করা যাবে না। বাবারা সন্তানের চোখের পানি সহ্য করতে পারে না। বহু কষ্টে কান্না থামিয়ে অন্য রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে মাথায় উপর বালিশ দিয়ে নীরবে কিছুক্ষণ কাঁদলো রঞ্জু। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে রঞ্জু ঘুমিয়ে গেলো সে নিজেও টের পেলো না। ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলো সে। বইমেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। আশেপাশে কত লেখকদের অটোগ্রাফ কত মানুষ বই কিনছে।

দুই

এই বছর রঞ্জু বেশ খুশি অবশেষে বই মেলায় যাওয়া হবে। মাটির ব্যাংকটি ভাঙ্গলো। ব্যাংকে বেশিভাগ ১ টাকার কয়েন। হিসেবে করে দেখা গেলো ৭০ টাকা জমা হলো।

রঞ্জু খুশি মনে বাবার কাছে গিয়ে বলল, বাবা ৭০ টাকা হয়েছে মাটির ব্যাংকে কবে বই মেলায় নিয়ে যাবে।

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন চিন্তা করলো। তারপর বললো, এই ৭০ টাকা দিয়ে  খুব বেশি হলে একটি বই কেনা যাবে। এক কাজ কর রঞ্জু তোর স্কুলের পাশে যে লাইব্রেরিটা আছে সেখান থেকে ৭০ টাকা দিয়ে একটি বই কিনে ফেল। একটি বই কেনার জন্য বাস ভাড়া খরচ করে মেলায় যাবি। শুধু শুধু বাস ভাড়া খরচ হবে।

তিন

রঞ্জু বাবার কথায় রাজি হলো। আসলেই তো বাবা ঠিকই বলেছে। এক বই কেনার জন্য বাস ভাড়া দিব। টাকা অপচয় হবে। তার চেয়ে লাইব্রেরি গিয়ে একটি বই কিনে ফেলি।

সেদিন রাতে রঞ্জু বাবার সাথে লাইব্রেরিতে গিয়ে একটি গল্প বই কিনলো ৭৫ টাকা দিয়ে। ৫ টাকা বাবা দিয়েছে এতেই খুশি রঞ্জু। লাইব্রেরি থেকে বই কেনার পরে বাড়ির  উদ্দেশ্য রওনা দিলো রঞ্জু ও তার বাবা। ফেরার সময়  রঞ্জুর হাত থেকে বইটি নিয়ে বাবা বলে, রঞ্জু চিন্তা কর এখন আমরা বই মেলা থেকে বাড়ি যাচ্ছে। তোর হাতে অনেক বই্। তুই বহন করতে পারছিস না। কিছু বই আমার হাতে দিলি।

এই কথা বলে রঞ্জুর বাবা খিল খিল করে হাসা শুরু করলো। বাবার হাসি দেখে রঞ্জুও হাসতে শুরু করলো। দুই বাপবেটা হাসতে হাসতে বইমেলা থেকে ফিরছে  হাতে অনেক বই।