আমি এবং একজন আয়না

4
35

মুভি রিভিউ লেখার মত দক্ষতা আমার নেই। অনেকেই দেখি খুব সুন্দর রিভিউ লিখে। চমৎকার সব বিশ্লেষণ থাকে লেখার মাঝে। পড়তেই ভালো লাগে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা হতো মুভি রিভিউ লেখার। কিন্তু অদক্ষতা থাকার কারণে লেখা হয়নি। এখনো দক্ষতা আসেনি। তবে আয়নাবাজি নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করছে। কোন রিভিউ টাইপের কিছু নয়। শুধু মাত্র আমার মুভি দেখা পর অনুভূতি এবং মুভি দেখার গল্পটা নিয়ে লিখব। এই লেখাটাকে মুটেও রিভিউ বলা যাবে না।

এক:
ঢাকা শহর ! এই নামটা শুনলে প্রথম আপনার কোন দৃশ্যটি চোখে ভেসে আসে? নিশ্চিয় জ্যাম, গরম, ফেরি ওয়ালার ডাক, গাড়ির হনের শব্দ, রাস্তায় মানুষের ভিড়, গাড়ির জন্য দীর্ঘ লাইন, রাস্তা পাশে খোলা ড্রেন এবং ময়লা ইত্যাদি দৃশ্য ভেসে আসবে। আমার চোখে এই দৃশ্যগুলোই ভেসে আসতো এতদিন। কিন্তু আয়নাবাজি দেখার পরে এই দৃশ্যটা পরিবর্তন হলো। আমি নিজেই অবাক হয়েছি।

ঢাকার দৃশ্য বলতে এখন আমার চোখে চমৎকার কিছু ভিউ ভেসে বেড়ায়। প্রচন্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় গাড়ি চলছে, ফ্লাই ওভারের মধ্যে গিয়ে চলন্ত বাস ছুটে যাচ্ছে, পাড়ার ছেলেরা হাতে বল আর ব্যাট নিয়ে রোডের মোড়ে ক্রিকেট খেলছে। এই রুপ দৃশ্যগুলো আগেও দেখেছি। কিন্তু চমৎকারভাবে নিজের মনের মধ্যে গেঁথে যায়নি। এখন কেন যেন মনে হচ্ছে এই দৃশ্যগুলো আমার শহরের। আমার প্রিয় শহরের ভালো দৃশ্যও রয়েছে।

আমার চোখে এটি আয়নাবাজি মুভির সবচেয়ে বড় সাফল্য। সম্পূর্ণ মুভিতে ঢাকার চমৎকার সব ভিউগুলো তুলে ধরা হয়েছে। ক্যামেরায় কাজটা আমাকে আকৃষ্ট করেছে।

“তুমি যদি বলো ভোরের বেলা কাক/শব্দ করা একলা স্টিমার, ফেরিওয়ালার হাঁক/লাঠি হাতে ডাকাত সর্দার/রাতজাগা হাইওয়ের ঘুমিয়ে পড়া কোনো এক ড্রাইভার/এই শহর আমার এই মানুষ আমার”

দুই:
ছেলেবেলায় হুমায়ন আহমেদের বইগুলো আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। এখনো মাঝে মাঝে হিমু বা মিসির আলি বইগুলো মাঝে মাঝে পুরণায় পড়ি। হুমায়ন আহমেদের বইগুলোতে ‘হিপনোটিজম’ বলে একটি বিষয় থাকে। সেখানে কথা বলে কোন মানুষের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। আমার কাছে এই বিষয়টি বেশ ভালো লাগতো। আমি নিজে নিজে অনেকবার চেষ্টা করতাম এই হিপনোটিজম বিষয়টি রপ্ত করার জন্য। মানুষের সাথে কথা বলার সময় আমি চেষ্টা করতাম তাদের সাইকোলজি বুঝে কথা বলা। যদিও প্রজেক্টে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। হুমায়ন আহমদের হিমু পড়লে মনে হয় হিপনোটিজম করা বেশ সহজ। কিন্তু আসলেই তা নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বিষয়গুলো গল্পেই ভালো মানায়। সত্যি কি হিপনোটিজম করা সম্ভব কাউকে? এই প্রশ্ন আমরা রয়েছে বহুকাল ধরে। আসলেই কি সম্ভব। যদি কখনো সময় হয় আমি সাইকোলজি শিক্ষকদের সাথে কথা বলব বিষয়টি নিয়ে।

aynabaji

আয়নাবাজি মুভিটি দেখার একটি পযায়ে আমি হুমায়ন আহমেদ ফিল পেলাম। আয়না মাস্টার স্কুলের শিক্ষার্থীদের হিপনোটিজম করে বনে জঙ্গলে ঘুরাতে নিয়ে চলে যায়। এরুপ দৃশ্য হুমায়ন আহমদের বহু বইয়ে দেখেছি। স্কুলের কোন পাগলা শিক্ষক থাকে যে কিনা ছাত্রদের হিপনোটিজম করে থাকে।

আমি আমার স্কুল জীবনে এমন একজন শিক্ষকের দেখা পেয়েছিলাম। স্যারের নাম ছিলো দত্ত বাবু। স্যার আমাদের ক্লাসে এসে প্রায়ই বলতেন চোখ বন্ধ করো। তারপর আমরা সবাই চোখ বন্ধ করতাম। স্যার আমাদের নানা সুন্দর সুন্দর বর্ণনা দিতো। কখনো নদীর বর্ণনা, কখণো পাহাড়, কখনো ক্রিকেট মাঠের। যখন স্যার বর্নণা দিতো আমি কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতাম। আহা ! সেই স্কুল জীবন।
যখন আমি কিছুটা বড় হলাম। তখন কোচিং সেন্টার ক্লাস নিতাম। ছাত্রদেকে আমিও মাঝে মাঝে হিপনোটিজম করার চেষ্টা করেছি। তাদের ক্লাসে চোখ বন্ধ করে নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে বললাম। আমি দত্ত বাবু স্যারের মত সফল হয়নি। ব্যর্থ্ই বলা চলে।

আয়না মাস্টার যখন ছাত্রদের হিপনোটিজম করছে তখন আমি যেন আমার স্কুল ও কোচিংয়ে ক্লাস নেয়ার সময়ে ফিরে গেলাম। মুভিটি এই পর্যায়ে এসে আমি সত্যিকার ভাবে নস্টালজি হয়ে গেলাম।

তিন:
আয়নাবাজি মুভিটিকে আই ১০০ এর মধ্যে ১০০ মার্কস কখনো দিব না। মুভটি ভালো হয়েছে তা ঠিক। তবে যতটা আশা করেছিলাম ততোটা ভালো লাগেনি আমার কাছে। এর চেয়ে মাটির ময়না, আহা, রানওয়ে এই মুভিগুলো আমার বেশি ভালো লেগেছে। তবে মেকিং আর গল্প বলার স্টাইল ও অভিনয়সব মিলিয়ে বেশ ভালো হয়েছে মুভিটা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মুভির কাহীনি সংক্ষেপ যদি আমি রিভিউতে বলে দেই তাহলে হলে গিয়ে মুভি দেখে মজা পাবেন না। মুভির কাহিনী আগে জেনে গেলে কোন মজা থাকে না। আমি আমার জীবনে প্রথম হলে গিয়ে বাংলা মুভি দেখলাম সেটা হলো আয়নাবাজি।

বসুন্ধরায় টিকেট কেটে মুভিটি দেখেছে আমার খরচ হয়েছে ২৫০ টাকা। আমি বলব এই টাকা আমার উসুল হয়েছে। অনলাইনে সাম্প্রতি মুভিটির প্রাইরেসি বের হয়েছে। অনেকেই ডাউনলোড লিংক চাচ্ছে আমার কাছে। কিন্তু আমি কাউকে লিংক দিচ্ছি না। আমি চাইলে গুগল সার্চ করে ক্লাউড বিভিন্ন সার্ভার থেকে মুভিটি ডাউনলোড করে দিতে পারি। কিন্তু তা করছি না। নিজের মধ্যে কাজ করছে এভাবে প্রাইরেসি করে নিজেদের মেধা বা শিল্পকে পথে বসানোর কোন মানে নেই।

তাই অনুরোধ করব যারা মুভিটি এখনো দেখেনি তারা হলে গিয়ে মুভিটি দেখুন। যান্ত্রিক এই জীবনে কিছুটা সময় হলেই ভালো থাকবেন।

4 COMMENTS

  1. খুব ভাল লেখা। পরিদর্শন টা ও দারুন করেছো বুঝাই যায়।

  2. বারী কষ্ট করে পড়া ও মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। তুমিও তো মুভিটি দেখছো 🙂 কেমন লেগেছে?

Comments are closed.