নতুনবউঠান ও ঠাকুরপোর গল্প

0
8

মেয়েটির টেবিলের রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণের আফিম। যা খেলে দ্রুতই মারা যাবে সে, কিন্তু তা খাবে মেয়েটি। মৃত্যুর আগে মেয়েটি চিরকুট লেখা শুরু করলো। ঠিক চিরকুট লেখার পরেই মেয়েটি আফিম খেয়ে ফেললো। দুইদিন মৃত্যু যন্ত্রণা ফটফট করলো তারপর……..

তারপর কি হলো পরে বলছি। ঘটনাটি কবের জানেন? আজ থেকে ঠিক ১৩৩ বছর আগের। একটু পিছনে ফিরে যাই।

নয় বছর বয়সে মেয়েটির বিয়ে হয়। কিন্তু এত ছোট বয়সে এই মেয়েটি কিবা বুঝে। যার মাঠ দৌড়ে খেলা করার কথা সে কি বউ সেজে বসে থাকতে পারে? সংসারের অনেক দায়িত্ব নিতে হয়েছে তাকে। বড় জমিদার বাড়িতে বিয়ে হওয়া মেয়েটি ঘুরে ফিরে খেলতে চায়, বড় একটি মাঠে বন্ধুদের সাথে দৌড়াতে চায়। জমিদার বাড়ির চার দেয়ালের মাঝে বন্দি জীবন যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো তার কাছে। বয়সে অনেক বড় জামাইয়ের সাথে যেন কিছুই মিলছে না। তবুও বউ সেজে কঠিন অভিনয় করতে যেতে হচ্ছে মেয়েটির। সমাজের নিচু জাতি হিসেবে খ্যাত মেয়েটি জমিদার বাড়ির বৌ হয়েছে এটাই কম কি?

বাহিরের বৃষ্টি হলে মেয়েটির ইচ্ছা করতো ভিজতে। বাড়ির পাশে বাগানে কোন এক জোছনা রাতে হেঁটে বেড়াতে ইচ্ছা করতো মেয়েটির‍। দূরে কোথায় ঘুরতে চাইতো। রাতে বেলা ছাদে বসে থাকতে ইচ্ছা করতো। কিন্তু তার কিছুই পারতো না মেয়েটি।

একদিন বাগানে মেয়েটির সাথে পরিচয় হলো তার স্বামীর ছোট ভাইয়ের সাথে যাকে বাংলায় বলা হয়  দেবর। মেয়েটি দেবরকে ডাকতো ঠাকুরপো বলে আর দেবর তাকে ডাকতো নতুনবউঠান বলে।

ধীরে ধীরে দুইজনের বন্ধুত্ব হলো, একটা সময় ভাবী এবং দেবরের সম্পর্ক  বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসায় রূপ নিলো।

ছি: ছি: কি লজ্জা তাই না। আমাদের সমাজ একটা কিভাবে মেনে নিবে। বর্তমান যুগ এতটা আধুনিক হওয়ার পরেও এই অসম ভালোবাসা মেনে নিবে না আমাদের সমাজ। আর এই ঘটনা  তো আরও ১৩৩ বছর আগের!

যে দেবরের কথা বলছি তিনি কে জানেন? তিনি আর কেউ নয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর ভাবী হলেন রবি ঠাকুরের বড় ভাইয়ের বউ কাদম্বরীদেবী।

কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড-নোট - রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

জমিদার বাড়িতে কাদম্বরীদেবীর একমাত্র বেঁচে থাকার উপায় হয়ে উঠলো রবিঠাকুর। চাঁদ দেখা, বাগানে ঘুরে বেড়ানো, ছাদে বসে থাকে সবগুলো ইচ্ছা পূরণ করলো রবীঠাকুর। কাদম্বরীদেবীর ভালোবাসায় পরম মমতায় ঠাঁই পেলে রবিঠাকুর। দুপুরের অলস সময়ের কাদম্বরীদেবী কোলে মাথা রেখে অনেক কবিতা লিখেছে কবিগুরু। একদিন বৃষ্টিমাখা বিকালে দুইজন ভিজে একাকার। সেদিন কবিগুরু প্রথম চুম্বন করেছিলো কাদম্বরীদেবী ঠেঁটে। যে রাতের কথা সেদিন কাদম্বরীদেবী জন্মদিন ছিলো, সবাই ভুলে গেলেও রবিঠাকুর তা ভুলেনি। রাতে কাদম্বরীদেবীর রুমে দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো। তারপর সারারাত একত্রে কাটালো দুইজন। মৃত্যুর আগে সেই স্মৃতি মনে করে কতটাই না কেঁদেছিলো কাদম্বরীদেবী।

তার চিরকুটের অংশ বিশেষ,

“তোমার নতুনবউঠানের দিন ফুরালো। তার জীবনের শেষ দিন। আর তো সময় নেই আমার। মাথা ঘুরছে। চোখ বুজে আসছে। দৃষ্টি ক্রমেই ঝাপসা। আর বুকের ভেতরটা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এলো যে। আমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছি।

ঠাকুরপো,আর প্রায় কিছুই দেখতে পারছি না। তবুও লিখে গেলাম আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।”

কেন আত্মহত্যার পথে যেতে হলো কাদম্বরীদেবীর? কারণ রবীঠাকুর বিয়ে করেছিলো। কিন্তু কাদম্বরীদেবী রবিঠাকুরের পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারবে না কাদম্বরীদেবী । সেটাই তো হওয়ার কথা তাই নয় কি? নিজের প্রিয় মানুষটার ভাগ কি আমরা কাউকে দিতে পারি?

দুইদিন মৃত্যু যন্ত্রণার কষ্ট পেয়ে মারা গেলেন কাদম্বরীদেবী। মৃত্যু আগে চিরকুটে তিনি লিখেন,

ঠাকুরপো, আমার মৃত্যুর জন্য তুমিও দায়ী নয়। তোমার জীবনের শুরু হলো নতুন খেলা, জায়গা তো ছেড়ে দিতেই হবে পুরাতনকে। তুমিই তো লিখেছ ঠাকুরপো,

ঢাকো তবে ঢাকো মুখ, নিয়ে যাও দু:খ সুখ

চেয়ো না চেয়ো না ফিরে ফিরে,

হেথায় আলয় নাহি, অনন্তের পানি চাহি

আঁধারে মিলাও ধীরে ধীরে।’

তাই হোক ঠাকুরপো, আধারের মিলিয়া যাব আমি।কিন্তু তুমি দায়ী নয় কোনওভাবেই। ঠাকুরপো, আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী আমার অমোঘ নিবোর্দ নিয়তি। পাপ যাকে বিদ্ধ করে না। পুণ্য যাকে বদলাতে পারে  না।

আমাকে মনে রেখো রবি। একথাটুকু বলার স্পর্ধাও আমার নেই। আমার সব গেছে সব গেছে।

রবি-শুধু ভালোবাসাটুকু যায়নি। আজও তোমাকে খুব ভালোবাসি। এইটুকু বিশ্বাস করো।

……তোমার নতুনবউঠান


শেষ এই লাইনটুকু লেখেই কাদম্বরীদেবী মৃত্যুর পথে চলে গেলো।

আত্মহত্যার পর রবিঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথের আদেশে আত্নহত্যার  সব প্রমাণ পুড়িয়ে ফেলা হয়। ঘুষ দিয়ে বন্ধ করা হয় সকলের মুখ। কাদম্বরীদেবী লেখা সুইসাইড নোট বা চিরকুটটি পুড়িয়ে ফেলায় হয়। কিন্তু ঝলসানো চিঠি উদ্ধার হয় বহুদিন পর। কে রক্ষা করেছিলো চিঠিতে? তা সত্যি বড় প্রশ্ন?

রবিঠাকুরকে  নিয়ে গবেষনা করে লেখার  ক্ষমতা আমার নেই। কিছুক্ষণ আগে পড়ে শেষ করলাম রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড নোট  বইটি। বইটি পড়ে আমার নিজের মত করে কাদম্বরীদেবীর অবস্থান লিখলাম মাত্র।  বইটা পড়ার পর কাদম্বরীদেবীর জন্য সত্যি খুব খারাপ লাগছিলো। মৃত্যুর আগে মানুষটার অনুভূতিগুলো আমাকে কাঁদিয়েছে। সুইসাইড নোটের শেষ লাইনটুকু পড়তেই যেন আমার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠলো। আনমনে চোখের কোনায় জল চলে আসলো। লেখার কোন ভুল ক্রুটি থাকলে ক্ষমা করবেন।

আপনার যদি বইটি পড়তে ইচ্ছা  করে তাহলে এই ঠিকানা থেকে বইটি ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।