চুপে তাঁহার পায়ের চিহ্নরূপে

2
38

আনন্দ বাসা থেকে দ্রুত বের হয়ে গেলো। আকাশের অবস্থা ভালো  নয়। কিন্তু দ্রুত বের হওয়ার কারনে ছাতা নিতে ভুলো গেলো সে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর আজ এই দিন। খুব বেশি উত্তেজিত মনে হচ্ছে তার। তাই তো দ্রুত বের হয়ে পরা যেন রাস্তায় জ্যাম না হয়। ঠিকঠাক সময়মত যেন পৌছতে পারে  নিধারিত জায়গায়।

বাসে উঠে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আনন্দ চিন্তা করতে শুরু করলো আচ্ছা বৃষ্টি কি হবে? বৃষ্টি হলে যদি সব উল্টা পাল্টা হয়ে যায়? কেমন যেন অস্থির লাগা শুরু  করলো। বুকের বামপাশে ধুক ধুক করা শুরু করলো। বার বার পানির পিপসা পাচ্ছে। সব কিছু ঠিকঠাক ভাবে হবে তো? চিন্তা করতে করতে নানা ভাবনার মাঝে হারিয়ে গেলো আনন্দ। এরই মাঝে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। বর্ষাকালের বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ নেই। যাকে বলে কাকভেজা বৃষ্টি। বৃষ্টির ধরণ দেখলে বোঝা যায় এই বৃষ্টি কতক্ষন হবে। জোরে বাতাসের সাথে বৃষ্টি হলে সেই বৃষ্টি কম সময় থাকে। তবে ধীরে গতির বাতাসের সাথে হালকা ঝুম বৃষ্টি মানে ঘন্টাখানেক বৃষ্টি হবে এটা নিশ্চিত।  এই বৃষ্টির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টি হবে।

এই বৃষ্টির দিনে যদি কদম ফুল পাওয়া যেত, তাহলে বেশ মজা হতো তাই না? কদম ফুল দেখলে কি অশ্রুদশর্ণী খুশি হতো?  নানা প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করলো।

আনন্দের বৃষ্টির থিওরি ঠিকভাবে কাজ না করে আনন্দকে  অবাক করে দিয়ে বৃষ্টি থেমে গেলো। বৃষ্টির থামার পরপর আনন্দ বাস থেকে নেমে পড়লো। রাস্তা অপর পাশে দেখা গেলো  ফুল বিক্রি হচ্ছে। অনেকগুলো ফুল এর মধ্যে লাল গোপাল, গাঁদা , রজনীগন্ধার সংখ্যাই বেশি। এর  মাঝে  আনন্দ দেখতে পেলে শাপলা ফুলের মত একটি ফুল। এই ফুলটি সে কখনো দেখেনি।

boy-photography-rain-stones-water-Favim.com-356805

আনন্দ  কখনো দোকান থেকে ফুল কিনে নি। রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফুল কিনলে লোকজন কেমন করে যেন হা করে তাকিয়ে থাকে বলে আনন্দের ধারণা। ফুল কিনলেও সবাই ভাবে হয়ত প্রেমিকা দেয়া হবে?  কেমন অপলকভাবে ফুল হাতে যাওয়া ব্যক্তির দিকে লোকজন তাকিয়ে থাকে। যা আনন্দের কাছে অসস্থি লাগে।

জীবনে প্রথমবারের মত ফুল কিনতে গেলো আনন্দ। শাপলার মত ফুলটার নাম পদ্মফুল। প্রথমবারের মত পদ্মফুল দেখে মোহরিত হয়ে গেলো সে। এই ফুলটা অশ্রুদশর্নী দেখলে কত না খুশি হবে। অশ্রুদশর্নী অল্পতে খুশি হয়ে যায়। খুব সামান্য একটা জিনিস দিলেই খুশিতে লাফাতে থাকে।

সাহস করে ফুল কিনে ফেললো আনন্দ। আশেপাশের কেউ তাকালো কিনা সে দেখার চেষ্টা করে ফুলটা ব্যাগের ভিতরের রেখে দিলো। হাতে নিয়ে হাঁটলে লোকজন দেখবে। হা করে আনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকবে যা খুব বিরক্তকর বটে।

আনন্দ কলেজের ঠিক উল্টা পাশে দাড়িয়ে আছে। টিপটপ বৃষ্টি শুরু হলো। বিশ মিনিট পর অশ্রুদশর্নীর ক্লাস ছুটি হবে। দীর্ঘ একমাস পর অশ্রুদশর্নীকে দেখা যাবে। প্রচন্ড খুশি ভাব কাজ করা শুরু করলো। ইচ্ছা করছিলো খুশিতে লাফ দিতে। মনে হচ্ছিল পৃথীবির সবচেয়ে খুশির মানুষ আনন্দ। অশ্রুদশর্নীকে জীবনে প্রথমবারে মত কেনা পদ্মফুলটা আনন্দ দিবে। আচ্ছা ফুলটা পেয়ে ও খুশি হবে তো? নিশ্চিয় খুশি হবে। এই ফুল হয়ত ও আগে দেখেনি।

অপেক্ষা পাল্লা যেন শেষ হচ্ছে না। প্রতিটি মিনিটকে আনন্দের কাছে মনে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ। অবশেষ অশ্রুদশর্নী বের হচ্ছে। রাস্তা ওপার থেকে দেখা যাচ্ছে। তবে চিনতে একটুকুও দেরি হয়নি। অশ্রুদশর্নী  চুল বেনি করেছে। দেখতে মনে হচ্ছে কলেজে পড়ে না স্কুলে পড়ে সে। চোখে চশমা, কানে ছোট ছোট দুইটি দুল, কপাল হালকা করো রংয়ের একটা টিপ এবং কলেজ ড্রেস। সব কিছু মিলিয়ে বেশ চমৎকার লাগবে অশ্রুদশর্নীতে। আনন্দ মনে মনে বেশ খুশি ফুলটা অবশেষ দেয়া হবে। অশ্রুদশর্নীতে দীর্ঘ একমাস পর দেখা হলো।

আনন্দকে দূর থেকে দেখে অশ্রুদশর্নী হেসে দিলো। আনন্দও হেসে দিলো। রাস্তা অপর পাশ থেকে দুইজনের চোখ যেন বলছে কেমন আছো? কতদিন পর দেখা? তারও এত দূর থেকে? কবে কাছ থেকে দেখব।

আনন্দ চিন্তা করলো হয়ত অশ্রুদশর্নী রাস্তার এপারে আসবে। কিন্তু তার আগেই অশ্রুদশর্নীর মা গাড়ি নিয়ে হাজির। মেয়েকে কলেজ থেকে নিতে প্রতিদিন তিনি আসেন। আজ ওনার আসার কথা না। অশ্রুদশর্নী তাই জানে। কিন্তু কেন আসলো? অশ্রুদশর্নীর মন খারাপ করে আনন্দের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে পৃথীবির সমস্ত দু:খ এসে ভর করলো অশ্রুদশর্নীর চোখে। টিপটিপ বৃষ্টি সাথে যেন অশ্রুদশর্নীর অদৃশ্য চোখের গুলো মিসে যাচ্ছে।

মায়ের সাথে গাড়িতে উঠে শাঁ শাঁ  করে চলে গেলো অশ্রুদশর্নী। আনন্দ গাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে অশ্রুদশর্নী লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আনন্দকে দেখছে আর চোখ দুইটি লাল হয়ে আছে। মায়ের কারনে কান্না লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে অশ্রুদশর্নী। আনন্দেরও প্রচন্ড কান্না পেতে শুরু করলো। জীবনের প্রথমবারের মত কেনা পদ্ম ফুলটা আর দেয়া হলো  না অশ্রুদশর্নীকে। ষ্টির পানিতে ফেলে যাওয়া অশ্রুদশর্নীর পায়ের চিহ্নের দিকে তাকিয়ে আছে আনন্দ। ফুলটা  ব্যাগেই রইল………..

আর কোথা থেকে যেন একটা গানে সুর ভেসে আসলো……..

মেঘ বলেছে ‘যাব যাব‘, রাত বলেছে ‘যাই’,.
সাগর বলে ‘কূল মিলেছে– আমি তো আর নাই’ ॥
দুঃখবলে ‘রইনু চুপে তাঁহার পায়ের চিহ্নরূপে

2 COMMENTS

  1. অশ্রুদশর্নী কে নিয়ে লেখা আরেকটি গল্প ভাল লাগল।

Comments are closed.