তখন কি, মা, চিনতে আমায় পারো?

3
11

আমি কেঁদে উঠলাম। অনুভব করতে পারলাম  আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে আর  কাঁদছি। বুকের ভিতরে একটা শূন্যতা কাজ করছে। যখণ প্রচন্ড কষ্ট হয় তখন হার্টবিট বেড়ে যায়, অস্তির লাগতে থাকে। অবস্থা এরকম যে জীবন্ত কোন মানুষের গায়ে আগুন ঢেলে দিলে যা হয়। পানির পিপসা পাচ্ছে। যন্ত্রনায় বিছানায় ফটফট করছি।

এভাবে কতক্ষণ সময় পার হলো তা বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে কয়েক ঘন্টা ধরে চলছে এই অবস্থা। পরক্ষণে মনে হলো আরে আমি তো ঘুমে আছি স্বপ্ন দেখছি। সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। অন্ধকারে হাতরে মোবাইলে সময় দেখলাম ৩টা বাজে। বিছানা থেকে উঠে বসার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বুঝতে পারলাম আমার উঠতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। শরীর প্রচন্ড দুর্বল মনে হচ্ছে। কপালে হাত রেখে  বুঝলাম জ্বর এসেছে, তাই শরীরটা এরকম। জ্বরে ঘোরে অনেক আজেবাজে খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। এখন মনে হচ্ছে মৃত্যু ঘটিত কোন স্বপ্ন দেখেছিলাম তাই কেঁদে উঠেছিলাম স্বপ্নে।

কষ্ট করে উঠে বসলাম সাথে সাথে রুমে আম্মা প্রবেশ করলো। কিরে তুই ঠিক আছিস তো? এসে আমার কপাল হাত দিলো। বলে উঠলো, এ কি অবস্থা জ্বরে গাঁ পুড়ে যাচ্ছে। এখুনি পানি দিতে হবে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আম্মা এত রাতে কখন আমার রুমে আসে না। আমার জ্বরটা রাতেই উঠেছে। কিন্তু আম্মা কিভাবে বুঝলো? আম্মার তো ঘুমানোর কথা এই সময়।

Charles_W._Bartlett_-_'Hawaiian_Mother_and_Child',_watercolor_and_pastel_on_art_board,_c._1920
তাড়াতাড়ি করে মূহুতের মধ্যে বালতিতে পানি এনে বিছানায় শুয়িয়ে আমাকে পানি দেয়া শুরু করলো। মাথা পানি ঢেল দিয়ে আম্মা আলতো করে  মাথায় বিলিকেটে দিচ্ছে। ভয়ংকর ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে সারাটা জীবন জ্বর থাকুক। মায়ের স্পর্শগুলো কতটা আসাধারণ। মাথায় আম্মা পানি ঢালছে আমি রহস্য সমাধান করার চেষ্টা করছি। আম্মা কেন আমার রুমে আসলো? কিভাবে বুঝলো আমার জ্বর? আম্মার তো এই সময় ঘুমানো কথা।

রহস্য সমাধান করতে করতে কখন যে আমি ঘুমিয়ে গেলাম তা জানা নেই। সকালে ঘুম ভাঙ্গলো। উঠে দেখি আমার সামনে আম্মা খাবার নিয়ে দাড়িয়ে আছে । আম্মা বলে, কষ্ট করে উঠে দাঁতটা ব্রাশ করে খেতে আয়, দেখবি জ্বর টর সব চলে যাবে। খেতে বসলাম। জ্বর কিছুটা কম। আম্মা আমার প্রিয় খাবারটাই রান্না করছে সকালের নাস্তা হিসেবে। কিভাবে এই মানুষটা পারে? রাতে উঠে মাথা পানি দিলো। সকাল না হতেই খিচুরী, কলিজ ভুনা রান্না করে ফেললো :O

পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারে কাছে গেলে যেন টাকাকে টাকা মনে হয় না। মনে হয় কাগজ। ব্যাপারটা হারে হারে টের পেয়েছিলাম আমার ক্যান্সার আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে যখন হাসপাতালে দৌড়াতে হয়েছে তখন। ডাক্তার দেখানো, নানা পরীক্ষা, অপারেশন, ওষধ, কেমো থেরাপি, রেডিও থেরাপি, আবার অপারেশন। মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষ এতটা খরচ ম্যানেজ করা বড়ই কষ্টকর একটা কাজ। কিন্তু আল্লাহর রহমতে সব কাজ ঠিকভাবে হয়েছে। টাকা অভাবে কোন কাজ আটকে থাকেনি। আম্মা এতটা সুন্দরভাবে সবকিছু ম্যানেজ করেছে। বাবার অপারেশনের সময় টানা ১৫ দিন হাসপাতালে ছিলো আম্মা।

mother-and-baby-digital-art-hd-wallpaper-1920x1200-961

 দুই:

জীবন যখন প্রথম টাকা আয় করলাম তখণ আম্মাকে নিয়ে গেলাম শপিং করতে। শপিং বলতে অনেক কেনাকাটা না। আম্মাকে একটা শাড়ি কিনে দিব। আমার যে বাজেট এতে মোটামোটি ভালো মানের একটা শাড়ি পাওয়া যাবে। আম্মাকে কয়েকটা দোকান ঘুরিয়ে যা বুঝলাম তাহলো, আম্মা আগে শাড়ির দাম দেখে। যে শাড়িগুলো দাম কম সেগুলোই পছন্দ করে। একটা শাড়ি পছন্দ হয়েছে তবে দাম বেশি হওয়ার পরক্ষণে আম্মা বলে না না এটা পছন্দ হয়নি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম। বললাম আম্মা, এটাই কিনব ।এবং কিনে ফেললাম।

বাহিরে এসে আম্মা বলছে, কি দরকার ছিলো এত টাকা দিয়ে শাড়িটা কেনার। এই টাকা দিয়ে তুই কতদিন চলতে পারতি। বড় হয়েছিস টাকা পয়সা তো লাগে তাই না। আমরা তো তেমন কিছু দিতে পারি না। তুই চলবি কি করে বাকি মাসটা?

আমি বললাম, আম্মা টাকা দিয়ে কি হবে? আজ আছি কাল নেই। মারা গেলে সব শেষ । পৃথীবিতে আছো কিছু খরচ করে যাও। নিজের চাহিদা পূরণ করো। সারা জীবনতো শখ করে কিছু কিনোনি। খালি আমাদের দিয়ে গেছো।

rickshaw-journey-e0a6b0e0a6bfe0a695e0a6b6e0a6be-e0a6ade0a78de0a6b0e0a6aee0a6a3

বাসায় যাওয়া জন্য রিকশা নিতে গেলাম আম্মা আমার হাত টেনে ধরলো। চলো হেটে চলে যাই। এমনেই শাড়ি কিনে তো কতগুলো টাকা নষ্ট হলো। আমি আম্মা দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে রিকশা ঠিক করে রিকশায় উঠলাম।

রিকশায় উঠে দেখি আম্মার চেহারাটা কাঁদো কাঁদো ভাব। রাস্তায় দেখে কাঁদতে পারছে না। বাসায় হলে ঠিকই কেঁদে ফেলতো । আম্মা বলছে,  অভাবের সংসারে তোদের কোন চাহিদা ঠিকভাবে পূরণ করতে পারিনি বাবা। কত কষ্ট করে টিউশনে করে করে টাকা দিয়ে চলিস এখন। শাড়ি কেনার কি দরকার ছিলো……….কথাগুলো বলতে বলতে আম্মা গলা ধরে এলো।

রিকশা দ্রুত চলছে। দমকা বাতাসে আমার চুলগুলো উড়ছে। আমি কথা ঘুরানো চেষ্টা করলাম। আম্মা জানো আমার সব চুলে পড়ে যাচ্ছে। মনে হয় দ্রুতই টাক্কু হয়ে যাবে।

আনন্দে মানুষের দু:খে স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। তখন সুখের কারণে কান্না পায়। আম্মার তাই হয়েছে। একটা শাড়ি আম্মাকে কতটা আনন্দ দিয়েছে তা টের পেলাম। মায়েরা অতি অল্পতেই খুশি হয়। সন্তান যদি একটা চকলেট এনে দেয় তাহলেই  মায়েরা খুশি হয়ে যায় বাচ্চাদের মত করে।

তবে সেদিন রাতে আম্মা কেন আমার রুমে আসলো এই রহস্য সমাধান করতে পারিনি। আম্মার কাছে একদিন জানতে চেয়েছিলাম। আম্মা উত্তর দিলো, মায়ের মন বলে কথা, যেদিন বাবা হবি সেদিন বুঝবি।
আজ মা দিবস। চারপাশে কর্পোরেট মায়ের ভালোবাসা, ফেইসবুক জুড়ে মায়ের প্রতি ভালোবাসয় ছড়িয়ে যাবে।  তবুও সব  মায়েরা ভালো থাকুক।

3 COMMENTS

  1. মা কে নিয়ে যে কোন লেখা আমার চোখে পানি নিয়ে চলে আসে। আশা করি আরও লিখবে মা কে নিয়ে।

    • ধন্যবাদ আপু মন্তব্যের জন্য। মা………নামটা শুনলে বার বার চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছা করে। আরও লিখব কথা দিচ্ছি।

Comments are closed.