দ্বিধাময় আনন্দ

2
10

আজ আনন্দের সাথে দেখা হবে। কিন্তু কোন উত্তেজনা ফিল করছি না। অথচ একটা সময় ওর সাথে  দেখা হওয়ার তিনদিন আগে থেকে কি যে উত্তেজনা ফিল করতাম। বার বার মনে হতো সময় কেন যাচ্ছে না। প্রতিটি মিনিটকে মনে হতো এক একটা মহাকাল। দুইদিন আগে থেকে ড্রেস বাছাই শুরু করতাম। কি কথা বলব, কোথায় ঘুরতে যাব ইত্যাদি ঠিক করে রাখতাম। কিন্তু ওর সামনে প্ল্যান অনুযায়ী কিছুই বলতে পারতাম না। রাতে ঘুম হতো না। ঘুমের মধ্যে ওকে শুধু স্বপ্ন দেখতাম।

কিন্তু এখন কেন এই ধরনের কোন অনুভূতি পাই না। সম্পর্ক পুরান হলে কি ফাটল ধরে? নতুন সর্ম্পক হলে যেমন আকর্ষণ থাকে তেমন থাকে না? তাহলে ওকে বিয়ে করার পর কি হবে? তখন কি সত্যি ভালো লাগবে না? এমনি নানা প্রশ্ন যখন মনে  উঁকি দিচ্ছে  তখনই ফোনটা বেঁজে উঠলো।

হ্যালো।

অপর পাশ থেকে আনন্দ বলছে,  “কি করো? আজ বিকালে দেখা হবে মনে আছে তা??”

আমি বললাম, হুম মনে আছে।

আনন্দ, সকালে খেয়েছো? এখন কেমন আছো?

হুম ভালো আছি। তুমি খেয়েছো? তোমার খবর কি?

এ তো যাচ্ছে।

এরপর কেউ কোন কথা বলছে না। দুইজন চুপচাপ ফোন কানে নিয়ে বসে আছে।

আমি বললাম, “আনন্দ আর কিছু বলবে কি?”

আনন্দ বলল, “না। তুমি কিছু বলবে?”

আমি ফোনটা রেখে দিলাম। ইদানিং এমনটা হচ্ছে। আমাদের কথা বললার মত কিছুই নেই। হায়, হ্যালো, কেমন আছো এই সব ছাড়া কিছুই বলার নেই। আনন্দ প্রতিনিয়ত কেমন যেন বোরিং হয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা খুব ভালো। আমাকে ছাড়া অন্য কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কে নেই এটা শিউর। তবে কেন এমন হয়ে যাচ্ছে সে। কেন আগে মত রোমান্টিকভাবে কথা বলে না। প্রতিদিন সেই বোরিং একই কথা বার্তা। এই সব কথা ভাবতে ভাবতে মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেলো। জানালার পাশে বসে কখন যে আনমনে কান্না চলে এলো ভেবেই পেলাম না।

ড্রয়ার থেকে ডায়েরিটি হাতে নিলাম। আমি প্রচন্ড ডায়েরি লিখতে পছন্দ করি। একটা সময় নিয়মিত ডায়েরী লিখলাম। মনে কথাগুলো ডায়েরিতেই লিখতাম। যখন আনন্দের সাথে পরিচয় হলো তখন ডায়েরিতে লেখা বন্ধ করে দিলাম। সব কিছু শেয়ার করতাম আনন্দের সাথে। মনে হতো সে আমার ডায়েরি। তাকে যেন সব কথা বলা যেতে। কিন্তু এখন আর আগে মত ওর সাথে কথা বলতে পারি না। মনে হয় কোথায় যেন সুরটা কেটে গেছে।

Love-Corner

আগে মত আনন্দ আমাকে সময় দেয় না। পড়াশুনার পাশাপাশি চাকুরি করে সে। সারাদিন জব করেই কাটে। মাঝে মাঝে ভাবি ইস আগে সময়গুলো যদি ফিরো আসতো। এভাবে আনন্দের সাথে আমি বেশিদিন থাকতে পারব না। কিছুদিন পর বাবা-মা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। ততো দিনে আনন্দের পড়াশুনাও শেষ হবে না। তাহলে কি হবে?

আনন্দকে কি ছেড়ে দিব? আমাদের পাঁচ বছরের সর্ম্পকটা ভেঙ্গে দিব? কিন্তু ওকে ছাড়া তো থাকতে পারি না। একদিন ওর সাথে কথা না বললে পাগলের মত হয়ে যাই আমি। রাতে ঘুম হয় না। আনন্দ আমার অভ্যাসে পরিনত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর প্রতি আমার ফিল কমে যাচ্ছে। আগের মত চাইলে ওকে তীব্রভাবে ভালোবাসতে পারছি না। তাহলে কি ভালোবাসার সর্ম্পকগুলো সময়ের প্রতিনিয়ত কমতে থাকে। কিন্তু কেন এমনটা হয়।

সময় দুপুর ৩ টা। আমি রেডি হচ্ছে। আনন্দের পছন্দের হলুদ রংয়ের ড্রেসটা পড়েছি। কপালে টিপ ও খুব পছন্দ করে। কালো রংয়ের টিপ দিলাম। হাতে আনন্দের দেয়া কাচে চুড়ি পড়লাম। চুড়িগুলো পড়ার সময় সেদিনের কথা মনে পড়ে গেলো। চুড়িগুলো  আনন্দ কিনে দিয়েছিলো কোন এক নববর্ষের দিনে। সে বার প্রথমবারে মত কোন নববর্ষে আমরা বের হয়েছিলাম। টিএসসিতে রাস্তার পাশে বসে থাকা একটি চুড়ির দোকানে থেকে আমাকে চুড়িগুলো কিনে দিলো সে। আমি ওকে অনুরোধ করেছিলাম চুড়িগুলো যেন আমাকে পড়িয়ে দেয়। কিন্তু পড়ানো হলো না। সে কাহিনী মনে পড়ে আজও হাসি আমি। কি বোকা আর ভয় পেতে আনন্দ। ওর সহজ সরল মুখটা কথা মনে পড়ে গেলো। কালো রং ও পছন্দ। তাই শার্ট , প্যান্ট ও চশমা সব কালো পড়ে সে। যেন ম্যান ইন ব্ল্যাক।

আনন্দ কলা ভবনের সামনে বট গাছটার নিচে বসে আছে। দূর থেকে আমি ওকে দেখছি। ওর কাধে একটা ব্যাগ, কালো জিন্স প্যাট, কালো টি-শার্ট ,চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। ছেলেটাকে দেখে মায়া লাগছে।  ওকে নিয়ে কত কথাই না ভাবি সারাদিন। কিন্তু ওকে যখন সামনে সামনে দেখি তখন সব ভুলে যাই। ইচ্ছা করে বাসায় আর ফিরে যাব না। সারাটা জীবন আনন্দের সাথে কাটিয়ে দিব।

আনন্দের কাছে গেলাম। সে বলল, “ ৩০ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি।”

আমি বললাম, “সরি ড্রাইভার দেরি করেছে আর রাস্তায় খুব জ্যাম।”

আনন্দ বলল, “ইটস ওকে। কিন্তু দেরি করার জন্য তোমাকে শাস্তি দেয়া হবে।”

কি শাস্তি দিবে দাও।

আনন্দ একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, “ টিএসসির মোড়ে দুই প্লেট পানিপুরি তুমি খাওয়াবে আমাকে।”

আনন্দ যদি দেরি করত তাহলে আমি খুব অনেক রাগ করতাম। কিন্তু আজব ও আমার সাথে রাগ করতে পারে না। আজব ছেলেটা। এতো ভালো কেন সে। আবার মনে হচ্ছে ওর প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।

দুইজন একত্রে হেঁটে টিএসির উদ্দেশ্য যাচ্ছি পানিপুরি খেতে।

2 COMMENTS

  1. তাহলে ওকে বিয়ে করার পর কি হবে? তখন কি সত্যি ভালো লাগবে না?

    সুন্দর লেখা।

    তবে কি ! আমার তো মনে হয় ভালবাসার সম্পর্কগুলো ভাত খাবার মতন, খাবার সময় কিছুই মনে হয় না, কিন্তু ওটা ছাড়া আর চলেও না 🙂

    • প্রথমে মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ। আপনার উদাহরনটা ভালো লেগেছে। আসলে ভাতের মতই।
      হয়ত এই দ্বিধা নিয়ে বেঁচে থাকবে হবে বাকি জীবনে। 🙂

Comments are closed.