পদত্যাগ প্রসঙ্গে শাবিপ্রবি প্রতি জাফর ইকবাল স্যার খোলা চিরকুট

0
10

 সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেছেন। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করার প্রতিবাদে তিনি পদত্যাগ করেন। মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কমিটির এক বৈঠকে ভর্তি পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিলে তিনি পদত্যাগ করেন। এছাড়া ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে জাফর ইকবালের স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হক পদত্যাগ করেছেন।

সেই পদত্যাগ সর্ম্পকে স্যারের খোলা চিরকটু ।এই চিরকুটে স্যার তুলে ধরছেন কেন এই পদত্যাগ।
Muhammad_Zafar_Iqbal

প্রিয় শাবিপ্রবি,
শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বেশী সময় এক জায়গায়
কাটিয়েছি, আমরা দুজনেই এই সময়ের প্রতিটা মুহুর্ত উপভোগ করেছি। আমাদের ছাত্র-ছাত্রী এবং সহকর্মীরা আমাদের এই জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর আমাদের  কোনো ভাষা নেই।খুব স্বাভাবিকভাবেই এই দীর্ঘ সময়ে আমরা নানা ধরনের ঘাত প্রতিঘাতের সম্মুখীন হয়েছি। নিজেদের বিশ্বাসের প্রতি আস্থা ছিল বলেই আমরা সবকিছু সহ্য করেছি-এমনকি আমরা আমাদের শিশু সন্তানদের বছরের পর বছর ঢাকায় রেখে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করেছি। আমরা সব সময়েই জেনে এসেছি কিছু
মানুষ আমাদের বিরোধীতা করেছে, এর সাথে এটাও জেনেছি এখানকার কিছু মানুষ আসলে আমাদের পাশে আছেন।দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি যখন একেবারেই শেষ পর্যায়ে তখন হঠাৎ
করে আমরা দেখতে পেলাম যারা এতোদিন সবসময়ে আমাদের পাশে ছিলেন-তারা আমাদের পাশে নেই। সমন্বিত ভর্তি পক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্বকীয়তা পুরোপুরি বজায় রেখে ভর্তি পক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে।শুধুমাত্র একদিনে এক প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে এবং দেশের অসংখ্য
ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের ছুটোছুটি করতে হবে না। এই চমৎকার পদ্ধতিটি নিয়ে কারো কোনো দুর্ভাবনা থাকতে পারে –সেটি আমরা কখনো কল্পনাও পারিনি।আমরা পুরোপুরি অবিশ্বাস এবং বিস্ময় নিয়ে আবিস্কার করলাম বামপন্থী এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে বিরোধীতার সূচনা করলো এবং স্বাভাবিকভাবে সেটি অন্যরা গ্রহণ করলো। মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যখন এই পদ্ধতিটির বিরুদ্ধে অবস্থানকরলেন- তখন আমাদের মনে হয়েছে আমাদের সবকিছু নতুন করে ভেবে দেখার সময় হয়েছে।যারা সবসময়েই আমাদের সবকিছুর বিরোধীতা করে, আমরা তাদের বিরোধীতার বিরুদ্ধে এতদিন কাজ করে এসেছি। কিন্তু যারা আমাদের স্বজন, যাদেরকে পাশে নিয়ে কাজ করে এসেছি-তারা যদি আমাদের পাশে না থাকেন,তাহলে বুঝতে হবে অবশ্যই এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের বিদায় নেওয়ার সময় হয়েছে।এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন মেনে সকল সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও অতীতে শুধুমাত্র আমাদের উপস্থিতির জন্য অনেকবার বিশ্ববিদ্যালয়কে জিম্মি করে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নয়- সারাদেশের অসংখ্যা ছেলেমেয়েকে ক্ষতিগ্রস্থ করা হলো। আমাদের মনে হয় আমরা যদি বিদায় নেই তাহলে ভবিষ্যতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের আর এ ধরনের ক্ষতির সম্মুখীনহতে হবে না।৬০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসর নেওয়ার কথা ছিল- আমরা সেভাবে আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম।সম্প্রতি শিক্ষকদের অবসর নেয়ার সময় ৬৫ বছর করার কারণে আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেয়েছিল, এখন মনে হয় সেটিও আবার গুছিয়ে নেয়া যাবে।আমাদের একজনের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস লেখার ইচ্ছে, সেটিতে হাত দিতে পারব।যে শিশুকিশোরেররা চিঠিপত্র লিখে, সময়ের অভাবে তাদের উত্তর দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না- এখন থেকে সেটি সম্ভব হবে। আমাদের অন্যজনের নির্যাতিত মহিলাদের জন্য কাজ করার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল- এখন সেই পরিকল্পনার জন্য কাজ করতে পারবে। এছাড়াও আমাদের শিক্ষা ও উদ্ভাবনীমূলক কাজ নিয়ে আরো অনেক স্বপ্ন রয়েছে- আমরা এখন তার জন্য কাজ করতে পারব। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদেরকে নিয়ে পরিপূর্ণএকটা জীবন উপহার দিয়েছে। এই অপূর্ব অভিজ্ঞতাটি নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছি, সবারপ্রতি কৃতজ্ঞতা- এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন এই দেশএবং এই পৃথিবীর সর্বশেষ্ঠবিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে তখন আমরা গর্ব করে বলতে পারব আমরা এক সময়ে এখানে আমাদের শ্রম দিয়েছিলাম।

– মুহম্মদ জাফর ইকবাল
– ইয়াসমীন হক