একটি অসাধারন জীবনগাথাঁ পর্ব-১০ "নিজের মতো হও " – অপরাহ উইনফ্রে

1
12

 

অপরাহ উইনফ্রে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও ধনী উপস্থাপক। তাঁর বিশ্বজোড়া খ্যাতি স্বপরিচালিত ‘দি অপরাহ উইনফ্রে শো’র জন্য। ১৯৮৬ সালে শুরু হওয়া এই শো শেষ হয় ২০১১-তে। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে ১৯৫৪ সালের ২৯ জানুয়ারি তাঁর জন্ম। ২০১৩ সালের ৩০ মে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি এই বক্তব্য দেন।ভাবতেই দারুণ লাগছে যে আমি এখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তোমাদের জীবনে আজকের এই দিনটা একটা বিশেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি আর নতুন অধ্যায় শুরুর সময়। আমি খুবই কৃতজ্ঞ হার্ভার্ড থেকে সম্মানজনক ডক্টরেট অর্জন করতে পেরে।আমার টেলিভিশনের ক্যারিয়ার বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই শুরু হয়েছিল। আমি মিস ফায়ার প্রিভেনশন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল ১৬ বছর। সেখানে প্রশ্ন-উত্তরের একটা পর্ব ছিল। আমাকে প্রশ্ন করা হলো যে আমি বড় হয়ে কী হতে চাই? ঝটপট উত্তর দিয়ে দিলাম, আমি একজন সাংবাদিক হতে চাই। আমি এমনভাবে মানুষের গল্পগুলোকে অন্যদের কাছে তুলে ধরতে চাই, যাতে তাদের জীবনে তা কিছুটা হলেও ভিন্নতা নিয়ে আসে। উত্তরটা দিয়ে আমি নিজেই বেশ অবাক হলাম। বাহ্! দারুণ তো! আমি সাংবাদিক

 

হতে চাই, আমি পরিবর্তন চাই।আমি যখন টেলিভিশনে কাজ করা শুরু করি, তখন আমার বয়স ১৯ বছর। ১৯৮৬ সালে আমি আমার নিজের টেলিভিশন শো শুরু করি এবং আমার বিশ্বাস ছিল যে আমি সফল হব। প্রথম দিকে আমি প্রতিযোগিতার কথা ভেবে কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমি নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করি। যতটা সম্ভব কঠোর পরিশ্রম করি। তাই একসময় শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। অপরাহ উইনফ্রে শো ২১ বছর ধরে এক নম্বর অবস্থানে ছিল। এর সাফল্যে আমি খুবই খুশি ছিলাম। কিন্তু বছর খানেক আগে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে এবার নতুন করে কিছু শুরু করতে হবে। তাই আমি এই শো শেষ করে দিয়ে শুরু করলাম অপরাহ উইনফ্রে নেটওয়ার্ক, সংক্ষেপে ওউন। এর বছর খানেক পরে প্রায় সব গণমাধ্যমেই বলা হলো যে আমার এই উদ্যোগ ফ্লপ হয়েছে। কেবল ফ্লপ বললে ভুল হবে, মস্ত বড় রকমের ফ্লপ। সে সময়টাতে একদিন মি. ফস্ট আমাকে বললেন, হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য। কিন্তু আমি ভাবছিলাম যে আমি তাদের উদ্দেশে কী বলব, যারা পৃথিবীর সবচেয়ে সফল গ্র্যাজুয়েট। আমার তো সফলতার মাত্রা কমতে শুরু করেছে। অনেকক্ষণ ধরে ভাবতে লাগলাম। হঠাৎ পুরোনো দিনের একটা তত্ত্বকথা মনে পড়ল, ‘দুঃখ-কষ্ট সব সময় থাকে না, একসময় চলে যায়।’ আমার মনে হলো, হ্যাঁ, আমি অবশ্যই হার্ভার্ডে যাব এবং আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলব।কতটা উঁচুতে তুমি উঠতে যাচ্ছ বা উঠতে পারবে, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই কোনো গুরুত্ব থাকে না। জীবনের কোনো না কোনো সময় তোমাকে হোঁচট খেতে হবে। তুমি যদি সারাক্ষণ নিজেকে ঠেলতে থাকো ওপরে তোলার জন্য, তুমি কোনো একটা সময় নিচে পড়ে যাবে। তবে যখনই এ রকম একটা অবস্থার মুখোমুখি হবে তখন মনে রেখো, ব্যর্থতার মতো আর কিছু নেই। জীবন যখন আমাদের অন্য দিকে চালানোর চেষ্টা করে, সেটাই ব্যর্থতা। আমরা যখন গর্তে পড়ে যাই, তখন সেটা আমাদের কাছে ব্যর্থতার মতো মনে হয়। তাই গত বছর আমি নিজেই নিজেকে বোঝাতে লাগলাম। গর্তে পড়ে যাওয়ার সময়টাতে সত্যিই ভীষণ খারাপ লাগে। কিছুটা সময় দাও তখন নিজেকে চিন্তা করার জন্য যে তুমি কী হারিয়েছ? তবে অবশ্যই এর সমাধান আছে। তোমার ভুলগুলো থেকে শেখার চেষ্টা করো। কারণ, প্রতিটি অভিজ্ঞতাই তোমাকে শেখাবে এবং তোমার নিজের শক্তি সম্পর্কে, তুমি উপলব্ধি করতে পারবে। পরবর্তী সঠিক পদক্ষেপটি কী হতে পারে, সেটা তোমাকেই খুঁজে বের করতে হবে। নিজের ভেতরকার মূল মন্ত্র ও অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তখন সেটাই বলে দেবে যে কোন পথে তোমাকে যেতে হবে।

একটা ব্যাপার কি চিন্তা করেছ, এখন থেকে সব সময় যখনই তুমি তোমাকে গুগল করবে, তখন এর ফলাফলের মধ্যে থাকবে ‘হার্ভার্ড ২০১৩’। এখনকার সময়ের এই প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে এটা একধরনের কলিং কার্ড। এই দারুণ কলিং কার্ডটি ভবিষ্যতে তোমাদের জন্য চমৎকার বুলেট হিসেবে কাজ করবে, তা তোমরা আইনজীবী, সিনেটর, সিইও, বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অথবা টক শোর উপস্থাপক যা-ই হও না কেন।

আমার মনে হয় যে জীবনের একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এমন একটা জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করা, যেখানে তুমি কী হতে চাও, তাও বলবে। তুমি কী অর্জন করেছ, সেটা নয়, বরং তুমি কীভাবে অর্জন করেছ, তোমার জীবনের উদ্দেশ্য—এ সবকিছুর কথা বলবে। কেবল গৎবাঁধা একটা শিরোনাম ও কিছু কথা দিয়ে হবে না।

যখন তুমি পা পিছলে অন্ধকার গর্তে পড়ে যাবে, সে গল্পটাই তোমাকে সে অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসবে।

১৯৯৪ সালে আমি একজন ছোট্ট মেয়ের ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। সে মেয়েটি অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করার জন্য চাঁদা আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে নিজে নিজেই হাজার ডলার পর্যন্ত জোগাড় করেছে। তখন আমার মনে হলো, যদি এই নয় বছরের মেয়েটি একটা ঝুড়ি ও বিশাল হূদয় নিয়ে এমন কাজ করতে পারে, তবে আমি কেন পারব না? তখন আমি দর্শকদের অনুরোধ করলাম, তাদের সাধ্যমতো সাহায্য করতে। ক্ষুদ্র্র ক্ষুদ্র সংগ্রহ একসময় তিন মিলিয়ন ডলার ছড়িয়ে গেল। এই টাকা থেকে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি স্টেটের একজন করে শিক্ষার্থীকে সাহায্য করতে শুরু করলাম।

এখন যে ধারণাটা আমার কাছে বেশ স্বচ্ছ, আগে কিন্তু এমনটা ছিল না। আমি আগেও বলেছি যে আমি ১৯ বছর বয়স থেকে টিভির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ’৯৪ সালের দিকে আমি বুঝতে শুরু করলাম। তাই এমনটা ভাবা ঠিক না যে সবাই একসঙ্গে একই সময়ে সবকিছু বুঝতে পারবে। আমি বুঝতে পেরেছি যে আমি টেলিভিশন দিয়ে ব্যবহার হওয়ার জন্য না, বরং টেলিভিশনকে ব্যবহার করার জন্য এসেছি। এই শক্তিশালী মাধ্যমকে ব্যবহার করতে হবে আমাদের মানবীয় শক্তিগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

তোমাদের প্রত্যেকের ভেতরকার আলো তখনই চারদিক আলোকিত করবে যখন তোমরা চাইবে। মিসিসিপি গ্রামের এক ছোট্ট মেয়ে হিসেবে আমি তখনই বুঝেছিলাম, নিজের মতো হওয়া অনেক সহজ বারবারা ওয়ালটন হওয়ার চেয়ে।

জীবনে চলার পথে কখনো হতাশা আসতে পারে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে সমস্যা দেখা দিতে পারে, নানা রকম প্রশ্নও আসতে পারে। কিন্তু তোমার মধ্যেই সেই সম্ভাবনা আছে, যা দিয়ে সব রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি তুমি দাঁড়াতে পারবে। সেই সত্যকে যদি উপলব্ধি করতে পারো, তখন তুমি নিজেই বুঝতে পারবে যে কোন কাজটা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে, তোমাকে সুখী করবে। আর এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে তুমি তোমার পদচিহ্ন রাখতে পারবে। অভিনন্দন ২০১৩ সালের গ্র্যাজুয়েটদের।

সহায়ক : এক

1 COMMENT

Comments are closed.