হঠাৎ পেছন থেকে বাবা ডাকবেন…

0
7

আমার বাবা: মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে নিয়ে লিখেছেন তাঁর মেয়ে জয়া তাহের

 


বাবার সঙ্গে তোলা শেষ ছবি: কর্নেল আবু তাহেরের সঙ্গে জয়া তাহের

বিশেষ কোনো দিন বা বাবা দিবসে নয়, প্রতিটি মুহূর্তে বাবাকে মিস করি। সারা জীবনই মনে হয়েছে, আমি একজন অসম্পূর্ণ মানুষ। বাবা থাকলে যেসব জিনিস হতো, যা শিখতাম, তা হয়নি আমার জীবনে। ভালো কোনো সিনেমা দেখতে গিয়ে, ভালো কোনো বই পড়তে গিয়ে, এমনকি জীবনে প্রথম যখন প্রেমে পড়লাম, প্রথম যখন মা হলাম, তখনো বাবার অভাব অনুভব করেছি। মনে হয়েছে, আমার একজন পরম বন্ধু পাশে নেই, যাঁকে আমি হয়তো মনের সব কথা বলতে পারতাম। আবার ভাবি, আমি তো একজন বীরের মেয়ে। আমার বাবা কর্নেল তাহের জেলে থাকার সময় যদি ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাহলে কি মেয়ে হিসেবে আমার ভালো লাগত? আমার বাবা তো পৃথিবীর সাহসী মানুষদের একজন। এত বড় মাপের একজন মানুষ। এই যে আজ আমি লিখছি, সেটা তো বাবার জন্যই সম্ভব হয়েছে। ছোটবেলা থেকে যেখানেই যেতাম, সবাই বলতেন, আপনি জয়া তাহের। কর্নেল তাহের আপনার কে হন। তখন বাবার পরিচয় দিতে গর্বে বুকটা ভরে উঠত। আমি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলাম। এখন ঢাকায় তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছি। তবে যতবার বিমানবন্দরে আমার পাসপোর্ট পরীক্ষা করা হতো, ততবার সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলতেন, আপনি কি কর্নেল তাহেরের কেউ হন? আমার নয় বছর বয়সী ছেলে তো বলে, ‘মা, তুমি দেখি বিখ্যাত। সবাই তোমাকে চেনে।’ তখন আমি তাকে বলি, আমি বিখ্যাত নই। তোমার নানার কারণে এই সম্মান, ভালোবাসা পাই। বাবা যখন জেলে গেলেন, তখন আমার বয়স প্রায় পাঁচ বছর। আর বাবার সঙ্গে তো জীবনের অল্প সময় কাটিয়েছি। সবকিছু ঠিকঠাক পরিষ্কার মনে নেই। আমি চকলেট খেতে খুব ভালোবাসতাম। বাবা বাইরে নিয়ে গেলেই আমাকে চকলেট কিনে দিতেন।

জয়া তাহের

নিজের জন্যও কিনতেন। তখন একটা মজার খেলা ছিল। আমি বাবার মুখের চকলেটটা খেতাম, বাবা আমারটা খেতেন। বাবার স্মৃতি মনে করতে গেলে আমি ফিরে যাই আমাদের নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে। দোতলা বাড়িটির দোতলায় ছিল পাশাপাশি দুটি ঘর। একটিতে আম্মা আমার ছোট দুই ভাই যিশু ও মিশুকে নিয়ে ঘুমাতেন। অন্যটিতে আমি বাবার সঙ্গে ঘুমাতাম। যিশুর বয়স তখন দুই বছর আর মিশুর নয় মাস। বাবা এক পা দিয়েই আমাদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। এখন বুঝতে পারি, কী অপরিসীম মনের জোর ছিল তাঁর। বাবার স্মৃতি মনে করতে গেলে একটা ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। হাফপ্যান্ট পরা বাবা আমাদের বাসার সামনের বাগানে বসে আছেন আর আমি পাশে খেলছি। আমি বিড়াল খুব পছন্দ করতাম। বাবা একবার আমার জন্য বিড়াল কিনে এনে দিলেন। সেই বিড়াল নিয়ে রাতে আমি আর বাবা একসঙ্গে ঘুমাতাম। সেই সময়টা আসলে আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। এরপর হঠাৎ একদিন বাবা আর বাসায় ফিরলেন না। বাবার জন্য রোজই অপেক্ষা করি। কিন্তু বাবা আর আসেন না। একসময় আমাদের নারায়ণগঞ্জের বাসা ছেড়ে দিতে হলো। আমরা চলে গেলাম নানাবাড়ি কিশোরগঞ্জে। এর অনেক মাস পর আম্মা যিশু ও আমাকে নিয়ে ঢাকায় এলেন কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে। বাবা আমাকে আর যিশুকে কলা খেতে দিয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই বাবার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আমাদের একটা হেলিকপ্টারে করে গ্রামের বাড়ি কাজলায় পাঠানো হয়। এখনো মনে পড়ে, কাপড় দিয়ে বাবার পুরো শরীর ঢাকা ছিল না। মাথার চুল আর পা বেরিয়ে ছিল। বাবাকে গোসল করানোর পর ছোট মামা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে কোলে নিয়ে বাবার মুখ দেখান। দেখতে পাই, একটা শান্ত মুখ। বিশ্বাস হচ্ছিল না, বাবা মারা গেছেন। বড় হওয়ার পরও কতবার কল্পনা করেছি, ওটা যদি একটা দুঃস্বপ্ন হতো। এখনো মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখি, আমি হাঁটছি, হঠাৎ পেছন থেকে বাবা আমাকে ডাকবেন। আমি চমকে যাব.

উৎস:সহায়ক