একটি অসাধারন জীবনগাথাঁ পর্ব-৬ "বদলাতে হবে এই পৃথিবী-বান কি মুন"

0
11

জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব বান কি মুনের জন্ম ১৩ জুন ১৯৪৪। বান কি মুন ২০০৭ সাল থেকে জাতিসংঘের অষ্টম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনে এ বক্তব্য দেন।

2012-12-25-18-08-37-50d9eba550f39-untitled-12
উপস্থিত সবাইকে স্বাগত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের এই সম্মেলনে হাজির হওয়া সব সমর্থক ও মানবাধিকারকর্মীকে আমার অভিনন্দন। সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সব মানুষই স্বাধীন মর্যাদা ও সম-অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়।’ যার সহজ অর্থ দাঁড়ায়, একজন বা কয়েকজন নয়, সব মানুষেরই মর্যাদা ও অধিকার সমান। কোনো মানুষকে অন্য মানুষের অধিকার নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, লিঙ্গসমতা বিধান, শিশুদের রক্ষা ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ মানুষের অধিকার আদায় নিয়ে কাজ করছে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও যোজন যোজন পথ সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংঘ জাতিসংঘ শুধু বিভিন্ন ধরনের মানববৈষম্যের প্রতি আইনিভাবে বিরোধিতা করে না, বাস্তবেও এই বৈষম্য রোধে কাজ করে। সবার চেষ্টায় ধীরে ধীরে সমাজ থেকে বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকারসংশ্লিষ্ট কুসংস্কার ও কুপ্রথা বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে, যদিও সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমন সব কুপ্রথা এখনো নিয়মিত চর্চা হয়; যার ফল সব সময়ই বীভৎস ও বর্ণনাতীত।
প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে সারা বিশ্বে সহস্র মানুষ বিভিন্ন কারণে লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হচ্ছে, অনেকেই মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। বিভিন্ন দেশে এই বৈষ্যমের কারণে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। শিশু-কিশোরদের আঘাত করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় এখনো তাদের মারধর করা যেন স্বাভাবিক নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। স্কুলের পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে হাজারো শিশুকে। পারিবারিক ‘মর্যাদা’ দিয়ে বিচার করা হয় এসব শিশুর; যাদের ছোটবেলায় জোর করে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এসব অন্যায়-অবিচারের জন্য কষ্ট পাই। তাই আমি এখানে জাতি-বর্ণ-গোত্রের ঊর্ধ্বে সব মানুষের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলতে এসেছি। সব মানুষের সত্যিকারের মুক্তির জন্য সর্বজনীন সমতার জন্য কাজ করার আবেদন করছি।
আমি চিৎকার করে বলতে চাই, সব মানুষ লিঙ্গবৈষম্যের ঊর্ধ্বে। আমি লিঙ্গবৈষ্যমের শিকার মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে চাই। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামে দাঁড়ানোয় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ও দৃঢ়সংকল্প। মানুষের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করতে জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক মাধ্যম ও ভিত্তি রয়েছে। তাই জাতিসংঘকে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করতে হবে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য রোধে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কাজ শুরু হয়েছে। আমি জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনগুলোকে লিঙ্গবৈষম্য রোধ ও সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়েছি।
গত কয়েক দশকে ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন ও পুনর্গঠন চোখে পড়ার মতো। এসব দেশের সামাজিক আচারেও এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। আমি আর্জেন্টিনার কথা বলতে চাই, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনারই আছে আমার দেখামতে লিঙ্গবৈষম্যরোধী পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকর প্রশাসনব্যবস্থা। আমি আজকের সম্মেলনে আর্জেন্টিনা থেকে আসা মানবাধিকারকর্মী ব্ল্যাঁ রেদিকে স্বাগত জানাই, যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রতিবাদের কারণেই এ বছরের শুরুতে আর্জেন্টিনা সরকার সমলিঙ্গ অধিকারভিত্তিক আইন বাস্তবায়ন শুরু করে। নানা কারণে অন্ধকারাচ্ছন্ন বর্তমান পৃথিবীকে আলোকিত করতে হবে। আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক ও প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই, যারা সব মানুষের অধিকার নিশ্চিতের জন্য কাজ করছে।
সব ধরনের লিঙ্গ অধিকার নিয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। মানুষের অধিকার নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, সেসব নায়ককে আমাদের সমর্থন দিতে হবে। নতুন পৃথিবীর জন্য দরজা খুলে দিতে আমাদের তাঁদের সহযোগিতা করতে হবে। আমরা সেই নতুন পৃথিবীর দরজা বন্ধ হতে দেব না।
উনিশ শতকের আইনকানুনগুলো ছিল কুসংস্কার, কুপ্রথা থেকে সৃষ্ট। সেসব কালো আইনকানুনই আমাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে, মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকেই উসকে দেয়—বৈষম্যতার সূত্রপাতের মূলে আছে সেসব আইন। এসব আইনের বিলুপ্তি হওয়া প্রয়োজন। মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করতে, সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বদলাতে হবে পৃথিবী। অনাচারের পৃথিবীকে আলোর দিকে আনতে হবে। বদলানোর এই অঙ্গীকার ঐচ্ছিক নয়, সব রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক এসব আইন প্রণয়ন করতে হবে। বৈষম্য রোধে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমাদের জনসাধারণের মানসিকতা পরিবর্তনে উৎসাহ দিতে হবে। লিঙ্গবৈষম্য রোধ নিয়ে প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি সমতার কথা বলি। অনেক নেতা আমাকে সম-অধিকার-সমতা প্রতিষ্ঠা নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেন, কিন্তু সবাই ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। আমি বুঝতে পারি, সেসব দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সেসব রাষ্ট্রপ্রধানের দাঁড়ানো একাকী পাহাড় অতিক্রমসম কঠিন কাজের সমান। কিন্তু আমি মনে করি, রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য গুটিকয়েক মানুষের অধিকার বিনষ্ট হতে পারে না। এসব মানুষের অধিকার হরণের অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে কেউ দেয়নি। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতের আধিপত্য থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের সংখ্যালঘু সেসব অধিকার হারানো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়তা দেখাতে হবে। সরকার ও শাসনযন্ত্রের রাষ্ট্রে প্রচলিত কুসংস্কার ও কু-আচার প্রতিরোধে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব কুসংস্কার ও কুপ্রথাকে উৎসাহ দেওয়া যাবে না কখনোই।
পৃথিবীর প্রতিটি কোণে সর্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সচেতন মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার ও জনগণকে সম-অধিকারের জন্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে স্বাধীন মর্যাদা ও সম-অধিকার নিয়ে এই পৃথিবীতে প্রতিদিন বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে। বদলাতে হবে কুসংস্কারের এই পৃথিবীকে।
আপনাদের সবাইকে এ অঙ্গীকারের জন্য ধন্যবাদ।
উৎস:সহায়ক