একটি অসাধারন জীবনগাথাঁ পর্ব-৫ "মূল্যায়নের আশায় থেকো না" – বব ডিলান

0
11

বব ডিলান ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর অন্যতম শিল্পী। কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে। বব ডিলানের জন্ম ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায়। বিগত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে সংগীতজগৎ। গ্র্যামি, গোল্ডেন গ্লোব, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, পুলিৎজারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। বব ডিলান টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে বিংশ শতাব্দীর ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অন্যতম।

2012-12-11-14-58-50-50c74a2ab9e3f-untitled-4

অনেকেই আমার সাক্ষাৎকার নিতে চায়। কিন্তু আমি যদি পারতাম, তাহলে সেই সব মানুষের সাক্ষাৎকার নিতাম, যারা আজ বেঁচে নেই, কিন্তু ফেলে রেখে গেছেন অনেক অসমাপ্ত কাহিনি, জন্ম দিয়েছেন অনেক প্রশ্নের। হ্যাঙ্ক উইলিয়ামস, মেরিলিন মনরো, জন এফ কেনেডি, এমন আরও অনেকে, যাঁদের জীবন মানুষকে এখনো ভাবিয়ে তোলে। কোটিপতিদের জীবন আমাকে আকৃষ্ট করে না। আমি জানি না, টাকার পাহাড় জীবনে কী-ই বা দিতে পারে। যাঁদের কাজ আমার পছন্দ হয়, আমি সেই কাজগুলোকে শ্রদ্ধা করেই খুশি থাকি।
আমার মনে হয়, একজন গীতিকারের সবচেয়ে অসাধারণ গানগুলো পুরোপুরি তাঁর কল্পনার জগৎ থেকে আসে, যা তিনি বাস্তবে কখনো ছুঁয়ে দেখেননি। এ যেন এক অন্য রকম মুক্তি! যদিও নিজের বেলায় এমনটা করা সাধারণত হয়ে ওঠে না। বেশির ভাগ সময় চারপাশে যা ঘটে চলেছে, সেটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। কলেজের পড়াশোনার পাট আমার প্রথম বছরেই চুকে গিয়েছিল। লেখালেখি কিংবা সাহিত্য নিয়ে আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আমি শুধু আমার মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াই। আমি জানি, শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আমার অনেক জানাশোনা থাকার কথা, কিন্তু সত্যিটা তার বিপরীত। আমি এসব নিয়ে তেমন কিছুই জানি না। আমি লিখতে শুরু করেছিলাম কারণ, আমি গান গাইতাম। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল আমার জন্য। সবকিছু তখন খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল আর আমার কেবলই মনে হতো, কোনো একটি ব্যাপার নিয়ে গান থাকা উচিত। কারও না কারও সেই গানটি লেখা উচিত। তখন আমিই সেই গান লিখতে শুরু করে দিলাম। কারণ, আমি তা গাওয়ার জন্য ব্যাকুল ছিলাম। আমার আগেই যদি সেসব গান কেউ লিখে ফেলত, তাহলে আমি আর গান লেখা শুরু করতাম না।
এভাবেই জীবনে একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার জন্ম দেয়। আমিও নিজের মতো গান লিখতে থাকি। এসবের কোনোটাই আমি খুব গুছিয়ে কিংবা পরিকল্পনা করে করিনি। কবিতার বেলায়ও ঠিক তাই। হাইস্কুলের চৌকাঠ পেরোনোর আগে আমি কখনো কবিতা লিখিনি।
আমার বয়স যখন ১৮, তখন আমার হাতে এসে পড়ে গিন্সবার্গ, গ্যারি সিন্ডার, ফিলিপ হোয়ালেনের লেখা। তারপর আমি ফরাসি সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়ি, কবিতায় সুর বসাতে থাকি। তখনকার দিনে ফোক মিউজিক আর জ্যাজ ক্লাবের দারুণ চল ছিল, সেখানে কবিরা গানের সঙ্গে তাঁদের কবিতাও পড়ে শোনাতেন। আমার মনে বইয়ের পাতায় আটকে থাকা কবিতার চেয়ে কবির কণ্ঠে সেই প্রাণবন্ত কবিতা অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৬১ সালে আমি একের পর এক ফোক মিউজিক কোম্পানির কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হই। ফোকওয়েজ, ট্র্যাডিশন, প্রেস্টিজ, ভ্যানগার্ড—এরা সবাই আমাকে ফিরিয়ে দেয়। তারপর আমি কলাম্বিয়া রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তিপত্র সই করি। সেটা ছিল আমার জন্য একটি বিরাট ঘটনা। এভাবেই হয়তো আপাতদৃষ্টিতে যাকে ব্যর্থতা মনে হয়, নিজের অজান্তে সেটি ভবিষ্যতের সাফল্য বয়ে আনে। তখন আমি যদি সেই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ফোক মিউজিকের চুক্তি করতাম, তাহলে আমার সবকিছুই অন্য রকমভাবে হতো। মনে হয় না তাদের সঙ্গে আমার বেশি দিন থাকা হতো। মজার ব্যাপার হলো, তাদের অনেকের ব্যবসাই এখন উঠে গেছে!
১৯৬৬ সালে আমার খুব খারাপ ধরনের একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। আমার মেরুদণ্ডের কয়েকটি হাড় ভেঙে যায় আর আমি শয্যাশায়ী হয়ে পড়ি। আমার ক্যারিয়ার যেভাবে এগিয়ে চলছিল, তাতে বেশ ভালোভাবেই ছেদ পড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে এই দুর্ঘটনা জীবনের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়, আমি নতুন করে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি। এখন আমার মনে হয় সেই দুর্ঘটনা আমার জীবনে আশীর্বাদই বয়ে এনেছিল!
আমার ছোটবেলা কেটেছে দাদির কাছে। দারুণ একজন মানুষ ছিলেন তিনি, এখনো খুব মনে পড়ে তাঁকে। অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বড় হতে হয়েছে আমাকে। এমনকি কিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছি, ভবিষ্যতে কী হবে তাও সব সময় পরিষ্কার ছিল না। আমার একাকিত্বই আমাকে শক্তি জোগাত। কারণ, আমার জীবনকে আমি সম্পূর্ণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলাম আর যা চাইতাম, ঠিক তা-ই করতাম। মিনেসোটার উত্তরে আমার ছোটবেলার দিনগুলোতে আমার জীবনের অনেকখানি মিশে আছে। আমি জানি না, আমার জীবনটা কেমন হতো যদি আমি ইথিওপিয়া কিংবা দক্ষিণ আমেরিকায় বেড়ে উঠতাম। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম নিলেও আমি হয়তো সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষে পরিণত হতাম। আমার মনে হয়, পরিবেশের এই প্রভাবটা সবার বেলায়ই সত্যি।
যখন কেউ নতুন কিছু করে, পরিবর্তনের কথা বলে, তখন অধিকাংশ সময়ই তার পরিচিত মানুষেরা বা নিজের দেশের লোকেরা তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারে না। স্বদেশে সে হয়তো উপহাসের পাত্র হয়, কিন্তু দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের লোকেরা ঠিকই তার কদর বুঝতে পারে। গৌতম বুদ্ধের কথাই ধরা যাক, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের সম্পদ। এখন বৌদ্ধধর্ম সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে কোথায়? চীন, জাপানসহ এশিয়ার অন্য প্রান্তে। তবে হ্যাঁ, সত্যকে প্রথম প্রথম কেউই মেনে নিতে না চাইলেও একসময় তা নিজগুণেই প্রকাশিত হয়। তত দিনে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতাও গড়ে ওঠে। আপনা-আপনিই তখন লোকে সেই আদর্শে চলতে থাকে, যে আদর্শকে তারাই একদিন তাচ্ছিল্য করেছিল।
লোকে তোমার নামে অনেক কিছুই বলতে পারে। গণমাধ্যম অনেক গল্পই বানাতে পারে তোমাকে নিয়ে। এখনকার দিনে কোনো কিছু গণমাধ্যমে না আসার অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার আদৌ কোনো অস্তিত্বই নেই! সবকিছুই যেন ব্যবসা; ভালোবাসা, সত্য, সৌন্দর্য—সব। মানুষের স্বাভাবিক কথোপকথনও আজ বাণিজ্যের উপকরণ। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার কাছে এসবের কোনো কিছুই টিকবে না। তুমি নিজেকে কী মনে করো, তোমার কত বড় উপাধি আছে, এসব তাঁর কাছে অর্থহীন। তিনি কখনো মানুষকে সম্পদ কিংবা পেশা দিয়ে বিবেচনা করবেন না। তিনি বলবেন না এ একজন কোটিপতি, ও একজন চিকিৎসক, সে একজন খেটে খাওয়া মানুষ।
এখন পৃথিবীর রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। ষাটের দশকে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করত, তাদের অধ্যাপকেরা ছিলেন রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তাঁদের দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে শিক্ষার্থীরা পথে ছড়িয়ে পড়ত। আমি রাজনীতি নিয়ে যা জেনেছি, শিখেছি, সবই এসেছে পথে নামা সেই মানুষগুলোর কাছ থেকে। তখনকার পরিবেশটাই ছিল অন্য রকম। এখন সবাই অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, যে যার ঘর গোছাতে ব্যস্ত। একতা বলতে যেন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। তখনকার দিনে এত বিভেদ ছিল না। আজকের সঙ্গে সেদিনের তুলনা করতে গেলে মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদটাই আমার চোখে সবার আগে ধরা পড়ে।
সময় তার নিজের নিয়মে বয়ে চলছে। সবকিছুই বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন, একটু একটু করে। আমি নিজের চলার গতি কমিয়ে দিয়েছি, কিন্তু বাকি সবকিছুই বড় বেশি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আমি যখন ছোট্ট শিশু ছিলাম, আমি শিশুর মতো ভাবতাম। যখন বড় হলাম, আমি সেই শিশুসুলভ ভাবনাগুলোকে সরিয়ে রেখে দিলাম। আমি একটা ব্যাপার কখনোই বুঝতে পারি না, আর তা হলো মানুষ উদ্ধত হয় কেন? কেন মানুষ অহংকারী হয়ে ওঠে? লোকে এমনভাবে কথা বলে, চলাফেরা করে, জীবন কাটায় যেন অনন্তকাল ধরে তারা এভাবেই বেঁচে থাকবে। যেন মৃত্যু তাদের কখনো স্পর্শ করবে না। সবচেয়ে বড় সত্যিটাকেই তারা এভাবে অস্বীকার করে। আর মৃত্যুর পর তারা পৃথিবীতে কী রেখে যায়? ছেড়ে যাওয়া খোলসের মতো একটা শরীর আর কিছুই না।

উৎস:সহায়ক এক