শিশুর অটিজম: কিছু তথ্য

0
11

শিশুর অটিজম: কিছু তথ্য

দীর্ঘ পোস্ট। অটিজম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতার অংশটি অন্তত পাঠ করার অনুরোধ রইলো।

 

আচরণগত অস্বাভাবিকতা থেকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার

আমরা যাদের সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিনি, দিনের শুরুতে ঘুম ভাঙা থেকে দিনশেষে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত তাদের সকলের দৈনন্দিন আচরণ কি একইরকম? কখনোই না। কারণ মন-মানসিকতা, চিন্তাশক্তি, সাড়াপ্রবণতা (রিফ্লেক্স), যুক্তিবুদ্ধির স্তর– ব্যক্তিভেদে এসবের হেরফের ঘটে। তাই আমাদের কাজকর্ম ও আচার-ব্যবহারেও কিছুটা ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক।

খুব সাধারণ কিছু উদাহরণ দিই। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন ছবি তুলতে গেলে অস্বস্তিতে ভোগেন, স্বাভাবিক মুখভঙ্গিটা ধরে রাখতে কষ্ট হয়, যাদেরকে আমরা বলি ক্যামেরা-শাই। অ্যাকাডেমিক ও পেশাগতভাবে অত্যন্ত সফল কারো হয়তো জমায়েতে অনেকের সামনে কথা বলতে বা বক্তৃতা দিতে গলা বুজে আসে, হাত-পা কাঁপে। আমাদের শিক্ষকদেরও কেউ কেউ আছেন বহু বছর শিক্ষকতা করার পরও ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে লেকচার দিতে পারেননা। ভীড়ের মধ্যে পূর্ব-পরিচিত কাউকে দেখলে এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করলেও পারেন না কেউ কেউ। অদ্ভুত কিছু ভীতি বা ফোবিয়া আছে কারো কারো। ছোটবেলার স্কুলজীবনের কথা ভাবুন তো। স্পোর্টসের মাঠে হুইসেল শোনার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একসঙ্গে ছিটকে বেরুতে পারে না, দৌড়ের শুরুতেই কেউ কেউ দেরী করে ফেলে। ক্লাসে সবার পেন্সিল বা কলম ধরার ভঙ্গি একরকম না; অল্পতেই হাত ব্যথা হয়ে যায় কারো কারো, তরতরিয়ে পাতার পর পাতা লিখতে পারেনা সবাই। দৈনন্দিন জীবনে খুঁটিনাটি সূক্ষ্ম কাজে সবার হাত-আঙ্গুল সমান পারদর্শী না; ছোট সরু স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে স্ক্রু বসানো বা খোলার কাজটি একাধিকবার চেষ্টার পর তবেই ঠিকভাবে করতে পারেন, এমন আছেন অনেকেই। সহজ কোন কথা সহজে প্রকাশ করতে বা বোঝাতে ঠিক স্বচ্ছন্দ নন কেউ কেউ। পরিস্থিতি অনুযায়ী আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খান কেউ কেউ। এইসব ছোটখাট অসঙ্গতি বা স্বল্পমাত্রার অক্ষমতাকে সাধারণ ধারণায় আমরা স্বাভাবিক বলেই ধরেই নিই। অর্থাৎ পরম স্বাভাবিক আচরণ থেকে কিছুটা বিচ্যুতি গ্রহণযোগ্য।

কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এইসব অস্বাভাবিকতার এক বা একাধিক রূপ একই ব্যক্তির মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে প্রকটভাবে দেখা যায়। মনে রাখতে হবে, আলোচ্যক্ষেত্রে স্বাভাবিক কার্যক্রম/আচরণ থেকে উচ্চমাত্রার বিচ্যুতির জন্য দায়ী disability বা অক্ষমতাগুলো “প্রকাশ্য” নয়। যেমন, দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও দৃষ্টি-সংযোগ বা আই কন্ট্যাক্টে অক্ষমতা। কিংবা বাকশক্তি স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও কোন কথা স্বচ্ছন্দে বুঝিয়ে বলতে না পারা। এই hidden disability কোন সুনির্দিষ্ট অক্ষমতা নয়; এর সীমা বা আওতা (range) বিশাল; যা বোঝাতে ASD (Autism Spectrum Disorder) টার্মটি ব্যবহার করা হয়।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও আচরণগত সীমাবদ্ধতার বিশেষ কিছু লক্ষণের সামষ্টিক নাম অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (ASD)। কথাবার্তায় পিছিয়ে থাকা, আত্মমগ্ন থাকা, অসংলগ্ন আচরণ করা- অটিজমের কিছু সাধারণ লক্ষণ যেগুলো শিশুর ২/৩ বছর বয়স থেকে দেখা দিতে পারে।

সাধারণভাবে তিন ধরণের ডিজঅর্ডারকে ASD বলা হয়, এগুলো হলো–
১. অটিজম (Autism),
২. অ্যাসপারগার সিনড্রোম (Asperger Syndrome),
৩. PDDNOS (Pervasive developmental disorder not otherwise specified; আগের দুটো গ্রুপে পড়ে না এমন বিকাশগত সমস্যা)।

শারীরবৃত্তীয় রোগব্যাধি আর ASD আলাদা বিষয়। ম্যালেরিয়া বা পক্সের মতো রোগের উপসর্গ আমরা জানি; অন্য কোন জটিলতা না থাকলে সাধারণত যেকোন রোগীর দেহে এধরণের কোন রোগের প্রভাব মোটামুটিভাবে একই। কিন্তু ASD’র প্রভাব সম্পর্কে সবার জন্য অভিন্নভাবে প্রযোজ্য কিছু বলা কঠিন। অর্থাৎ অটিজম আছে এমন ব্যক্তি বা শিশুদের সবার বৈশিষ্ট্য বা সমস্যা যে একইরকম হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদেরই অধিকহারে ASD আক্রান্ত হতে দেখা যায়। অটিজমের ক্ষেত্রে মেয়ে ও ছেলে শিশুর অনুপাত ১:৪ এবং অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে ১:৫। খুব অল্পবয়সেই, ধারণা করা হয় জন্মের সময় থেকেই, ASD’র কারণে শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় দেড় থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যেই। শিশুর বিকাশের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে, ASD যেগুলোতে প্রভাব ফেলে (প্রভাবের ধরণ সংক্ষেপে ব্র্যাকেটে দেয়া হলো)–

১. সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া বা Social interaction-এর ক্ষেত্রে প্রভাব (অন্য কোন ব্যক্তির প্রতি আগ্রহের অভাব বোধ করা। কে কী করছে তা নিয়ে আগ্রহ বা কৌতূহল না থাকা। অন্যদের আচরণ বুঝতে না পারা। বন্ধু হতে বা পেতে অনিচ্ছুক থাকা।)
২. যোগাযোগ বা Communication-এর ক্ষেত্রে প্রভাব (কথা না শেখা। সীমিত শব্দভান্ডার ব্যবহার করে কোনমতে কথা বলা। কথা বলতে পারলেও আলাপচারিতা বা conversation এ সমর্থ না হওয়া।)
৩. আচরণ বা Behaviour-এর ক্ষেত্রে প্রভাব (পুনরাবৃত্ত আচরণ অর্থাৎ একই কাজ বারবার করা। নিজস্ব রুটিন অনুযায়ী কাজ বা আচরণে অভ্যস্ততা এবং এতে অনমনীয় থাকা।)

এবার দেখা যাক, ASD’র তিন গ্রুপের কোনটিতে শিশুর বিকাশের এই ক্ষেত্রগুলো কীভাবে প্রভাবিত হয়।

অটিজম আক্রান্ত শিশুর বিকাশ উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হয়। এদের অনেকে কথা শিখতে পারেনা বা কথা শেখা বিলম্বিত হয় (এখানে কথা শেখা আর কথা বলার মধ্যেকার পার্থক্যটি লক্ষ্যনীয়। বাকযন্ত্রের গঠন বা অনুরূপ কারণে শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য কথা বলতে না পারা ভিন্ন বিষয়। বাকযন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি যেমন কণ্ঠনালী, জিভ বা তালুতে কোন সমস্যা নেই, ধ্বনির উচ্চারণে অসুবিধা নেই, শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা হয়, তারপরও শিশু কথা না বললে বুঝতে হবে তার শেখার ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। আবার কোন কোন শিশু অবশ্য কথা বলতে পারলেও খেলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সময় কথা বলতে ইচ্ছুক থাকে না; মুখ বা শরীরের অঙ্গভঙ্গি অর্থাৎ বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে নিজের চাহিদা বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে; এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে না)। বেশীরভাগ অটিস্টিক শিশুর intellectual disability বা বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকে। ২০-৩০% অটিস্টিক শিশুর এই অক্ষমতা থাকেনা; যাদের অটিজমকে high-functioning autism বা অ্যাসপারগার সিনড্রোম বলা হয়।

অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের সাধারণত: বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকেনা। কখনো থাকলেও সেটা খুবই স্বল্পমাত্রার হয়ে থাকে। কথা শেখার বিচারে তারা তেমন পিছিয়ে নেই। তাদের মূল সমস্যা এই কথাগুলোকে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা নিয়ে। যেমন অন্য কারো সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নিতে তাদের সমস্যা হয়। কাউকে প্রশ্ন করা, অন্যের প্রশ্নের উত্তর দেয়া, বা কারও কথায় প্রাসঙ্গিক মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অক্ষমতার জন্য তারা প্রায়ই অমিশুক ও নিভৃতচারী হিসেবে চিহ্নিত হয়।

PDDNOS আক্রান্ত শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। বিকাশের তিনটি ক্ষেত্রেই তাদের সমস্যা হতে পারে; কিন্তু এই সমস্যার মাত্রা এতটা প্রকট নয় যে অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোমের আওতায় পড়তে পারে।

ASD’র মাত্রা নিরূপণ:
এমন কোন সহজ একক “টেস্ট” নেই যা দিয়ে ASD’র প্রভাব বা মাত্রা নিরূপণ করা সম্ভব। এজন্য জন্ম থেকে শিশুর বেড়ে ওঠা পর্যালোচনা করা হয় এবং তার ভাষাগত দক্ষতা ও বুদ্ধিস্তর যাচাই করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেশ-পরিস্থিতি-অবস্থা তৈরি করে তার আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটা আসলে বিভিন্ন সম্পর্কিত বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন অনেকগুলো যাচাই-প্রক্রিয়া বা অ্যাসেসমেন্টের সমষ্টি; এবং এই যাচাই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ।

||২||

ASD তথা অটিজম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতা

ভ্রান্ত ধারণা ১: ASD একটি মানসিক রোগ; এটা আচরণগত, আবেগঅনুভূতিগত, অথবা মানসিক স্বাস্থ্যঘটিত ডিজঅর্ডার। এখানে শারীরিক কোন সমস্যা সম্পৃক্ত নয়। বাস্তবতা: অটিজমের সঙ্গে বিকাশগত অক্ষমতা ও নিউরো-বায়োলজিকাল ডিজঅর্ডার জড়িত। জন্মের তিন বছরের মধ্যেই এটা প্রকাশ পায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি আজীবন এই অক্ষমতার সমস্যায় ভোগে।

ভ্রান্ত ধারণা ২: অটিস্টিকদের সবার সমস্যাই একরকম। বাস্তবতা: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিদের লক্ষণ ও উপসর্গের মাত্রা বিচিত্র। একজনের সঙ্গে আরেকজনের হুবহু মিল নেই। কেউ সবাক; বাকশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেউ কথা বলেনা। কারও আচরণ অ্যাগ্রেসিভ, কেউ অতিরিক্ত গুটিয়ে-থাকা স্বভাবের। Spectrum Disorder কথাটি অটিজমের বিশাল আওতার বৈশিষ্ট্য বোঝানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়।

ভ্রান্ত ধারণা ৩: পিতামাতার দুর্বল অভিভাবকত্ব সন্তানের অটিজমের জন্য দায়ী। বাস্তবতা: এই ধারণাটি অজ্ঞতাপ্রসূত এবং সম্পূর্ণ ভুল। অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখন পর্যন্ত অজানা; বা সুপ্রমাণিত নয়। অনিরূপিত অটিজমের ক্ষেত্রে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ না নেয়া হলে অবস্থার উন্নতি পিছিয়ে যায়; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জন্ম-পরবর্তী সময়কার weak parenting শিশুর অটিজমের জন্য দায়ী ছিল।

ভ্রান্ত ধারণা ৪: অটিজম নিরাময়যোগ্য, চিকিৎসা করালে অটিস্টিক ব্যক্তি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। এই ধারণার পিছনে মূলত: দায়ী হল নন-মেডিকেল সেলিব্রিটি ব্যক্তিত্বদের প্রচারণা (জেনি ম্যাকার্থি, অপরাহ্ উইনফ্রে প্রমুখ)। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং অতিনিবিড় ইনটারভেনশন ও থেরাপির মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্যতার এই প্রচারণার সঙ্গে চিকিৎসক-গবেষকরা এখনও একমত হননি।

ভ্রান্ত ধারণা ৫: ASD আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুপ্ত প্রতিভার অধিকারী। বাস্তবতা: অটিস্টিকদের কেউ কেউ হয়তো বিশেষ পরিস্থিতিতে খুব ভাল আইকিউ স্কোর করতে পারে অথবা বিশেষ কোন কাজে দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু এটা নিছকই ব্যতিক্রমী ঘটনা। সাধারণ অটিস্টিক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য মিডিয়ায়, চলচ্চিত্রে বা সাহিত্যে সমাদৃত হবার মতো আকর্ষণীয় কিছু নয়। বিশেষ কোন দক্ষতার অধিকারী অটিস্টিককে নিয়ে লিখিত উপন্যাস পড়ে, কিংবা তাকে নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি বা চলচ্চিত্র দেখে অনেকে ধারণা করে নেন ASD আক্রান্ত সবারই বিশেষ কোন প্রতিভা থাকে (যেমন গণিতে ভাল হওয়া)। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র রেইনম্যানে ডাস্টিন হফম্যানের চরিত্র, অথবা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের অটিজম থাকার গল্প অনেকেই জানেন এবং প্রাসঙ্গিক আলোচনায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে ভালবাসেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমেরিকায় শিশুদের প্রতি ১৫০ জন একজন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১৬০ জনে একজন শিশু অটিজম আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই গণিত-প্রতিভা বা অন্য কোন ক্ষেত্রে জিনিয়াস হওয়া দূরে থাক, খুব সাধারণ দৈনন্দিন কাজকর্মেও অন্যের উপর নির্ভরশীল।

ভ্রান্ত ধারণা ৬: ASD আক্রান্ত শিশুদের সবারই কোনকিছু শিখতে সমস্যা হয়। বাস্তবতা: ASD আক্রান্তদের মধ্যে কারো কারো কোন কিছু বুঝতে পারার ও শেখার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা থাকে। কিন্তু কেউ কেউ, বিশেষত অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্তদের অনেকেই, গণিতের মতো বিষয়ে মূলধারার শিশুদের মতোই দক্ষতা অর্জন করতে পারে। (স্মরণ করা যেতে পারে, অটিস্টিকদের ২০-৩০% অ্যাসপারগার সিন্ড্রোমে ভোগে)।

ভ্রান্ত ধারণা ৭: শিশুবয়সে নেয়া টিকা ASD-এর জন্য দায়ী। বাস্তবতা: ‘৯০এর দশকে এই ধারণাটি খুব প্রচার পেয়েছিল। টিকার সংরক্ষণে ব্যবহৃত উপাদানে থাকা মার্কারি বা পারদ এজন্য দায়ী– এমন কিছু গবেষণাও করা হয়। তবে ২০০১-২০০২-এ ব্যাপক আকারে হওয়া গবেষণার ফলাফল এই অনুমানকে নস্যাত করে দেয়।

ভ্রান্ত ধারণা ৮: ASD আক্রান্তদের জন্য বিশেষ ধরণের খাবার প্রয়োজন। বাস্তবতা: এটা সত্য যে অটিস্টিকদের অনেকেই দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার, গ্লুটেন সমৃদ্ধ খাবার ইত্যাদির প্রতি অ্যালার্জিক। চিনি ও ফুড এসিডের পরিমাণ বেশী, এমন খাবারও কারও আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে (উত্তেজনাবৃদ্ধি, খিটখিটে মেজাজ)। তবে এসব উদাহরণ কোন সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নয়।

ভ্রান্ত ধারণা ৯: এটা একটা সাময়িক সমস্যা; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেরে যাবে। কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার দরকার নেই। বাস্তবতা: অটিস্টিক শিশুর সমস্যাগুলো কখনোই পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়, যেটা করা যাবে তা হলো নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে তার ঘাটতি কমিয়ে আনা। মৃদু মাত্রার অটিজম, যেমন অ্যাসপারগার সিনড্রোমের ক্ষেত্রে যথাযথ সহযোগিতা, সমর্থন ও শিক্ষা পেলে পরিণত বয়সে আত্মনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব। উচ্চমাত্রার অটিজমের ক্ষেত্রে পরিণত বয়সেও অন্যের সাহায্য ছাড়া কখনোই স্বনির্ভর দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্ভব নয়।

ভ্রান্ত ধারণা ১০: একই পরিবারে অটিজম থাকার ঘটনা একবারের বেশী ঘটেনা। বাস্তবতা: যদিও অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোন কারণ এখনও সুপ্রমাণিত নয়; তারপরও জেনেটিক ডিজঅর্ডার অটিজমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে একই পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে একাধিকজনের এবং যমজ সন্তানদের উভয়ের অটিস্টিক হবার প্রবণতা দেখা গেছে।

ভ্রান্ত ধারণা ১১: অটিস্টিকদের সংখ্যা বাড়ছে না, আগেও একই হারে ছিল; এখন ডায়াগনোসিসের সুযোগ বেশী তাই সংখ্যা বেশী মনে হচ্ছে। বাস্তবতা: ইউএসএ’তে ষাটের দশকে প্রথম অটিস্টিক শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তবে তখন একে অব্যাখ্যায়িত অক্ষমতা হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ১৯৯১ সাল থেকে special education exceptionality হিসেবে অটিজমকে অন্যান্য শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতার বাইরে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরিভুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটা fastest-growing developmental disability এবং বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১০-১৭% (অটিজম সোসাইটি অফ অ্যামেরিকা’র ২০০৬ সালের তথ্যানুযায়ী)। পৃথিবীতে মাত্র চারটি দেশে অটিস্টিকদের সংখ্যার হিসাব রাখার ব্যবস্থা আছে (ইউএসএ, ইউকে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায়; তাও সর্বত্র অপেক্ষাকৃত মৃদু মাত্রার অ্যাসপারগার সিনড্রোম ও PDDNOS কে হিসেবের মধ্যে ধরা হয়না। এইসব দেশের হারকে ব্যবহার করে অন্যান্য দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে অটিস্টিকদের অনুমিত সংখ্যা হিসাব করা হয়। এটা নিছক ঐকিক নিয়মে ফেলে অংক করার মতো হিসাব; যেমন ধরা যাক, অমুক দেশে তিন কোটি লোকের মধ্যে এক লাখ অটিস্টিক; কাজেই বাংলাদেশের পনের কোটির মধ্যে পাঁচলাখের অটিজম আছে। বোঝাই যাচ্ছে এ থেকে সঠিক পরিসংখ্যান পাবার নিশ্চয়তা নেই)। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশের কোথাও কোথাও অটিস্টিকদের সংখ্যা ৫০০%-১০০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হার নিঃসন্দেহে আতঙ্কজনক। স্থানবিশেষে অটিস্টিকদের সংখ্যাবৃদ্ধির অস্বাভাবিক উচ্চহারের কারণ হিসেবে পরিসংখ্যানিক প্রক্রিয়ার আওতার পুনঃনির্ধারণকে হয়তো দায়ী করা যেতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হল এই হার সত্যিই বাড়ছে।

ভ্রান্ত ধারণা ১২: শিশুর কথা বলতে দেরী হলে বুঝতে হবে তার অটিজম আছে। বাস্তবতা: কথা বলার পাশাপাশি আরেকটি ব্যাপার আছে; “আলাপচারিতা”য় অংশ নিতে পারা। কথা বলতে দেরী হলেও এই কাজটা বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়েও অনেক শিশুই করতে পারে। দুই বছর বা তারও কম বয়স থেকেই মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে, হাত নেড়ে, কাঁধ ঝাঁকানোর ভঙ্গিতে অনেক কিছু বোঝাতে পারে মূলধারার শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু যখন সবে কথা বলতে শুরু করে, ততদিনে তার ভান্ডারে অন্তত একশ’ শব্দ জমা হয়ে যায়, যেগুলো অন্য কেউ বললে সে একটা সম্পর্কসূত্র পেয়ে যায়। কাজেই শিশু যদি মিশুক হয়, কেউ ডাকলে সাড়া দেয়, অন্যদের চোখের দিকে তাকিয়ে (আই-কন্ট্যাক্ট করে) কথা শোনে বা প্রতিক্রিয়া দেখায়– তাহলে দুশ্চিন্তার তেমন কিছূ নেই। তবে যে কোন শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো আর প্রচুর কথা বলা (শিশুকে প্রশ্ন করা, আবার তার উত্তর দিয়ে তাকে বোঝানো কীভাবে উত্তর দিতে হয়) তার মানসিক বিকাশের জন্য খুবই জরুরী।

ভ্রান্ত ধারণা ১৩: অটিজম থাকলে অন্য কোন ধরণের ডিজঅর্ডার থাকেনা। বাস্তবতা: অটিস্টিকদের ক্ষেত্রে ডাউন সিনড্রোম, সেরিব্রাল পালসি, অন্ধত্ব, বধিরতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা কিংবা অন্য কোন শারীরিক সমস্যা থাকার ঘটনা অস্বাভাবিক তো নয়ই; বরং সাধারণ।

||৩||

অটিস্টিক শিশুর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য

অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের সবার ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো একরকম হয়না। কেউ কেউ মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতায় ভোগে; কারও হয়তো সেই ক্ষমতা সীমিতভাবে থাকে। কিন্তু অটিস্টিক শিশুর মধ্যে খুব অল্পবয়স থেকেই (২/৩ বছর) অটিজমের কিছু বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। ২য় পর্বে জেনেছি শিশুবিকাশের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র রয়েছে; সেগুলোর ভিত্তিতেই উদাহরণ দেয়া যাক।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া

* শিশুকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া তো দেয়ই না, এমনকি চোখ ফিরিয়েও তাকায় না। সে হয়তো নামের ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনা, একেবারেই নির্লিপ্ত থাকে। অথবা ডাকের ব্যাপারটা শুনে বুঝতে পেরে যে কাজ বা খেলায় সে ব্যস্ত ছিল সেটা কিছুক্ষণের জন্য থামিয়ে দেয়; কিন্তু যে ডাকছে তার দিকে ফিরে তাকায়না।

* বাবামা বা নিয়মিতভাবে দেখা হচ্ছে এমন আপনজনদেরও চোখে চোখ রেখে তাকায়না। তার কাছে গিয়ে বা কোলে নিয়ে চেষ্টা করলেও দেখা যায়, খুব দ্রুতই সে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। eye-contact-এর অক্ষমতা অটিস্টিক শিশুর মধ্যে প্রকটভাবে দেখা যায়।

* সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মিশতে বা খেলতে চায় না। অন্য শিশুদের খেলতে দেখলে সে একপাশে সরে যায়। অন্যরা কী করছে, সেটা দেখতে বা তাদের খেলায় অংশ নিতে অনীহা বা বিরক্তি দেখায়। বেশীরভাগ অটিটিস্টিক শিশুকে ডায়াগনোসিসের আগেই পারিবারিক পরিমন্ডলে “অমিশুক” হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখা যায়।

* কোনো ধরণের আনন্দদায়ক বস্তু বা বিষয় সে অন্যদের সাথে শেয়ার করে না। সাধারণতঃ শিশুরা কোনো খেলনা হাতে পেলে সবাইকে সেটা দেখাতে চায়। কথা বলে বা অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিন্তু অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এধরণের কোনো খেলনার প্রতি নিজস্ব কিছু আগ্রহ থাকলেও সেটা নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস থাকে না।

* স্বাভাবিক শিশুরা কারো কোলে চড়তে বা আদর পেতে পছন্দ করে। কিন্তু অনেক অটিস্টিক শিশু এই ব্যাপারে নিস্পৃহ থাকে। অন্য কারো সংস্পর্শে যাওয়াটা তারা তেমন পছন্দ করেনা।

যোগাযোগ

** পরিবেশ ও প্রতিবেশ এর সাথে যোগাযোগ করার ক্ষমতা শিশুর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে ওঠার কথা। অটিস্টিক শিশুর ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষমতা কমে যায়- দেখা যায় ২ থেকে ৩ বছর বয়সে স্বাভাবিক শিশুরা যেসমস্ত শব্দ উচ্চারণ করতে পারে সমবয়সী অটিস্টিক শিশুরা তা পারে না। তখন সমবয়সী অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করে
বাবামা বিষয়টি বুঝতে পারেন।

** আবার কোনো ক্ষেত্রে অটিস্টিক শিশু হয়ত স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে, কিন্তু একটি বাক্য শুরু করতে অস্বাভাবিক রকম দেরি হয় অথবা বাক্য শুরু করার পর তা আর শেষ করতে পারে না। এমনও হতে পারে ৩-৫ বছর বয়সেও দু’তিন শব্দের বেশী শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন করতে পারেনা। নিজের প্রয়োজনের বিষয়টা উত্তম পুরুষে (ফার্স্ট পার্সোনে) না বলে নাম পুরুষে (থার্ড পার্সোনে) বলে। যেমন ‘আমি খাব’ না বলে ‘বাবু খাবে’ এভাবে বলে। বহুবার শোনা ছড়া থেকেও অল্প কিছু শব্দের বাইরে আর কিছু বলতে পারেনা। যেমন ‘তাই তাই তাই মামা বাড়ি যাই / মামী দিল দুধভাত পেট ভরে খাই / মামা এলো লাঠি নিয়ে পালাই পালাই’ এ ছড়াটাকে সে হয়তো সংক্ষেপ করে এভাবে বলে ‘তাই তাই মামা যাই দুধ খাই লাঠি পালাই’। কিংবা ‘আয় চাঁদ টিপ যা’ ইত্যাদি।

**শিশু একই শব্দ অথবা বাক্যাংশ বারবার উচ্চারণ করার প্রবণতা দেখাতে পারে। এসব শব্দ অর্থবোধক হতে পারে, নাও পারে। অটিস্টিক শিশুকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘তুমি কি দুধ খাবে?’ এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শিশু হয়তো প্রশ্নের শেষ অংশটিই আবার উচ্চারণ করে, ‘দুধ খাবে?’ শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়েই নয়, কোন আলাপচারিতায়, অথবা হঠাৎ করেই, প্রাসঙ্গিক হোক বা না হোক, একই শব্দ অথবা বাক্যাংশের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে থাকে। কেন একই কথা বার বার বলছে, কিংবা সেসব শব্দের অর্থ কী, এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শিশু একঘেঁয়ে পুনরাবৃত্তি চালিয়ে যায়। বাবা-মা মানা করলেও শোনে না, বরং বিরক্ত হয়, রেগে যায়, অথবা নিজেকে প্রকাশ করার অক্ষমতাজনিত হতাশা থেকে কাঁদতে শুরু করে।

** ৩ বছর বা তারও কম বয়সী শিশুরা তাদের বয়সোপযোগী নানা রকম খেলা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই তৈরি করে খেলে। সেভাবে কথা বলতে না পারলেও ইশারা-ঈঙ্গিত-হৈহল্লার মধ্য দিয়ে তারা লুকোচুরি বা গাড়ীর প্রতিযোগিতা বা প্লেন ওড়ানো বা লড়াই/যুদ্ধ– এমন কল্পনাভিত্তিক খেলাধূলায় (imaginative play) মত্ত হয়। কিন্তু অটিস্টিক শিশুরা এরকম করে না। পুতুল, গাড়ী, স্টাফড অ্যানিম্যাল (টেডি বেয়ার, মিকিমাউস, খরগোশ এসব) ইত্যাদি নিয়ে কল্পনাশ্রয়ী কোন খেলা (যেমন পুতুলকে খাওয়ানো, পুতুল কাঁদছে, গাড়ীটা জোরে চলতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে ফেলল এমন ভান করা) এরা খেলতে পারেনা।

আচরণ

*** অটিস্টিক শিশু বিশেষ ধরণের আচরণ বারবার করতে থাকে। হয়ত হাত দোলাতে থাকে বা আঙুল নাড়াতে থাকে। খেলনার বাক্স উপুড় করে খেলনা (ছোট বল বা মার্বেল) বের করে ফেলে; আবার ঢুকিয়ে রাখে। আবার বের করে, আবার ঢোকায়। এভাবে চলতে থাকে। কোন কোন শিশু ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়ে খেলতে চায়। সেক্ষেত্রে দেখা যায় লবণদানি থেকে লবণ ঢেলে বাটিতে রাখছে, আবার সেটা আগের জায়গায় নিচ্ছে। বা দুটো গ্লাস নিয়ে একটা থেকে আরেকটায় পানি ঢালাঢালি করে চলেছে। এই পুনরাবৃত্ত কাজে তারা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেয়; কয়েক ঘন্টাও চলতে পারে। যা দেখে সাধারণতঃ পরিবারের সদস্যরা বাচ্চাটিকে (ভুলবশতঃ) শান্ত স্বভাবের ভেবে স্বস্তি বোধ করেন।

*** অনেক অটিস্টিক শিশু আওয়াজ পছন্দ করে না। জোরে কথা বললে বা টিভি চালালে অস্বস্তি বোধ করে, কান্নাকাটি বা চীৎকার করে।

*** তারা রুটিন মেনে চলতে ভালোবাসে। দৈনন্দিন যে ধরণের জীবনযাপনে সে অভ্যস্ত, তার কোন ব্যতিক্রম হলে অটিস্টিক শিশুরা মন খারাপ করে, কাঁদে বা চিৎকার দিতে থাকে। বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও গেলে সে অস্বস্তিতে থাকে। রাতে ঘুমাবার আগে হাত মুখ ধুয়ে, কাপড় বদল করে বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস হয়তো প্রায় সব শিশুরই থাকে কিন্তু কখনো এর ব্যত্যয় ঘটলে সাধারণ শিশুরা কিছু মনে না করলেও অটিস্টিকদের বেলায় দেখা যায় তারা কোনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।

*** পারিপার্শ্বিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন তারা সহ্য করতে পারে না। ধরা যাক, ঘরে আসবাবপত্রের অবস্থান অদল-বদল করা হলো। এতে তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। গোসল করানোর জন্য তার জামা-কাপড় খুলতে হবে, বা গোসল শেষে আগে পরে থাকা জামাটার বদলে নতুন জামা পরতে হবে, এই সাধারণ পরিবর্তনের ব্যাপারগুলো তারা মানতে পারেনা। গ্রীষ্মের সময় জানালা খোলা রেখে ঘুমানো হলো, এতে অভ্যস্ত হবার পর শীতকালে জানালা বন্ধ করার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সে প্রতিক্রিয়া দেখায়। বা রাতে ঘুমানোর সময় শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দেও সে কাঁদে বা চিৎকার করে। এই প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটি অনেকক্ষণ ধরে চলে। এরকম প্রতিক্রিয়ার কারণে অটিস্টিক শিশুদের অনেককেই পরিবারে প্রাথমিকভাবে “জেদি” হিসেবে গণ্য করা হয়।

*** বিশেষ কোন কোন খেলনা বা সাধারণ কোন বস্তুর প্রতি তার অতিরিক্ত আকর্ষণ থাকে। সেটা সঙ্গে রাখতে চায় সবসময়। কিন্তু খেলনা হিসেবে সেটার যে বৈশিষ্ট্য, তা তাকে আকর্ষণ করেনা। যেমন কোন কোন শিশুর খেলনা গাড়ী চালানোতে আগ্রহ না থাকলেও কিন্তু সেটা উল্টে ধরে হাত দিয়ে চাকাগুলো ঘোরাতে দেখা যায়।

*** অধিকাংশ অটিস্টিক শিশু পেন্সিল বা কলম ধরে মুঠোবন্দী করে। দু’আঙ্গুল দিয়ে চিমটি দেয়ার মতো করে বা তিন আঙ্গুলে পেন্সিল ধরার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কিছু ধরতে পারেনা। হাত ধুয়ে মোছার আগে হাত থেকে পানি ঝেড়ে ফেলা বা কুলি করার কায়দাটা শিশুরা বড়দের দেখেই শিখে ফেলে। কিন্তু অটিস্টিক শিশু এই সাধারণ বিষয়গুলো আয়ত্বে আনতে পারেনা। শেখালেও দেখা যায় হাত ধুয়ে ঢেউয়ের মতো দোলাচ্ছে, পানি ঝরবে এমনভাবে ঝাড়তে পারছে না। হাত মুছতে গেলেও তোয়ালেটা এমনভাবে ধরছে যে ঠিকমতো মোছা হচ্ছেনা। Fine motor activityতে তাদের এমন বহু সমস্যা থাকে।

*** কেউ আঙুল দিয়ে কোন কিছু নির্দেশ করলে শিশু নির্দেশিত বস্তুর দিকে না তাকিয়ে বরং আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। মোটরস্নায়ুর সমন্বয় ক্ষমতার ঘাটতির জন্য এটা হয়।

*** অটিস্টিক শিশুর মোটরস্নায়ুতে সমস্যা থাকবেই। মোটরস্নায়ু কোন কাজ করার সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করে। এ স্নায়ুর জন্যই ভারসাম্য রেখে একপায়ে দাঁড়াতে পারা, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে কোন কিছু ছুঁড়তে পারা, ডিগবাজি দিতে পারা ইত্যাদি গ্রস-মোটর ক্রিয়া সম্ভব হয়।

*** কোনো কোনো অটিস্টিক শিশু আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে রেগে ওঠে বা ভয়ার্ত হয়ে যায়।

*** অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে পঁচিশ শতাংশের খিঁচুনি থাকতে পারে।

উপরের লক্ষণগুলোর মধ্যে যে কোন কোনটি সাময়িক সময়ের জন্য স্বাভাবিক শিশুদের মধ্যেও থাকতে পারে। তাই একটি লক্ষণ দেখেই বাবা মায়েদের তাদের শিশুটিকে অটিস্টিক ভেবে নেয়া ঠিক হবেনা। আর একজন অটিটিস্টক শিশুর মধ্যে যে উপরের সবগুলো লক্ষণ একসঙ্গে থাকবে তাও নয়। আবার বাবা মায়েদের এটাও খেয়াল রাখতে হবে; এ ধরণের কয়েকটি লক্ষণ সন্তানের মধ্যে বেশি দিন ধরে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদি তা হয় তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপণ্ণ হতে হবে।

||৪||

চার-এর অধিক বয়সী অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ কিছু আচরণ

স্বাভাবিক বা মূলধারার শিশুরা সাধারণত চার বছর বয়সের মধ্যেই অন্যদের– বিশেষ করে সমবয়সীদের– চিন্তাধারা, কথাবার্তা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এসব সম্পর্কে ধারণা করতে শেখে। স্কুলে বা ঘরোয়া খেলার আসরে অন্যকে দেখে সে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে একটা বিশেষ খেলায় অংশগ্রহণের জন্য তার ঠিক কী করতে হবে। সে অনুযায়ী দৌড়াদৌড়ি, লাফঝাঁপ, হৈহল্লায় সে নিজেকে নিয়োজিত করে ফেলে। এই প্রক্রিয়াটি এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে যে কীভাবে ঘটল তা আমাদের নজরে আসেনা। কিন্তু অটিজম থাকলে শিশুরা এ বয়স থেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে যায়। অন্যরা কি করছে- বা ভাবছে এ সংক্রান্ত চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের থাকেনা।

আমাদের দেশে একসময় শিশুরা পাঁচ বা ছ’বছর বয়সের আগে স্কুলে যেতনা। কিন্তু এখন তিন-চারের মধ্যেই প্লে-গ্রুপ বা কিন্ডারগার্টেনে যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা। অটিজম সম্পর্কে বাবা-মায়ের সম্যক জ্ঞানের অভাবে অনেকসময় শিশুর অস্বাভাবিকতা পরিবারে তেমন আমলে আনা হয়না। কিন্তু স্কুলে অভিজ্ঞ ও যত্নশীল শিক্ষকের পক্ষে এধরণের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রথমত শিশুর আচরণ লক্ষ্য করে, দ্বিতীয়ত সমবয়সী অন্য শিশুদের সঙ্গে আচরণের তুলনা করে, তৃতীয়ত গ্রুপ ওয়ার্ক বা দলগত কাজে শিশুর বিসদৃশ পারফর্ম্যান্স দেখে। প্রথম দুটি সহজেই অনুমেয়; শিশুর অন্যমনস্কতা, একটা বিশেষ কাজ বারবার করতে চাওয়া, পাঠক্রমে বা ক্লাসরুমের পরিবেশ সম্পর্কিত কোন রদবদলে তীব্র অস্বস্তি বা প্রতিক্রিয়া, বন্ধুত্ব স্থাপন বা কথাবার্তায় অনীহা বা অক্ষমতা, প্রচন্ড ভীতি-লজ্জা, অন্যকে বা নিজেকে আঘাত করা– এসব বিষয় শিক্ষকের দৃষ্টি এড়ানোর কথা না। গ্রুপ ওয়ার্ক বিষয়ক তৃতীয় ব্যাপারটি একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

ধরুন পাঁচজন শিশুকে একটা টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসিয়ে শিক্ষক কোন কাজ করাবেন, যাতে পালা করে কাজ করা (turn-taking), ভাগাভাগি করে নেয়া (sharing), দলগতভাবে কাজ করা (group performance) ইত্যাদি বিষয় জড়িত। হয়তো পাঁচজনের হাতে পাঁচটা রং পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে শিক্ষক কাগজে পাঁচ পাপড়ির একটা ফুল আঁকলেন। তারপর প্রথম শিশুটিকে দিলেন। নির্দেশনা অনুযায়ী সে হাতের রং-পেন্সিল দিয়ে একটা পাপড়ি রং করে কাগজটা এগিয়ে দিল পাশের জনকে। এভাবে শেষ জনকে দিয়ে পুরো ফুলটি রং করার কাজ সম্পন্ন হবার কথা। প্রথম বা দ্বিতীয় শিশুটির পরে আর নির্দেশনার প্রয়োজন হবার কথা না। কারণ স্বাভাবিক আগ্রহ থেকেই অন্য শিশুরা দেখবে কী করতে বলা হচ্ছে, তার “অংশ” বা “part” এখানে ঠিক কতটুকু। আগের জনের কাছ থেকে কাগজটা নিতে হবে, তারপর নিজের কাজটুকু করে পরের জনের কাছে হাতবদল করতে হবে। কিন্তু এদের মধ্যে যদি একজন অটিস্টিক শিশু থাকে, তবে সেক্ষেত্রে এই ঘটনাগুলো ঘটতে পারে–
১. শিক্ষক যখন কাজটি শুরু করছেন, তখন আই কন্ট্যাক্টের অভাবে বা অন্যমনস্কতার কারণে সেটা সে খেয়াল করবেনা।
২. একই ভাবে তার পূর্ববর্তী শিশুরা কী করছে, কেন করছে– সেদিকেও তার নজর থাকবেনা। বা তাকিয়ে থাকলেও “সিকোয়েন্স”-এর ব্যাপারটা সে ধরতে পারবেনা।
৩. তাকে যখন কাগজটা এগিয়ে দেয়া হবে, তখন সে বুঝতেই পারবেনা কেন এটা তাকে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোন প্রশ্ন করে সেটা জানতে চাইবে না। তার তখন চেষ্টা থাকবে এই বিষয়টা থেকে চোখ সরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু দেখার, করার বা বলার; অথবা অসংলগ্ন আচরণ করার।
৪. শিক্ষক তার কাছে গিয়ে বারবার বুঝিয়ে হাতে ধরে সাহায্য করলেও সে শুধু রং ঘষে তার “part” শেষ করবে। পরবর্তীজনের কাছে pass করার কাজটি সে করবেনা। কারো দিকে তাকাবেই না।
এখানে লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো, তাকে একা যদি একটা ছবি আর ক্রেয়ন দিয়ে বসিয়ে দেয়া হতো, সে হয়তো ঠিকই পুরো ছবিটা রং করে ফেলত। কিন্তু গ্রুপে করতে দেয়ায় তার সীমাবদ্ধতা বা অক্ষমতাগুলো প্রকটভাবে ধরা পড়বে। আমাদের দেশে ক্লাসরুমে শিশুদের গ্রুপ-ওয়ার্কের সুযোগ মেলে কম। কিংবা আদৌ মেলেনা। তাই অটিজম বা অ্যাসপারগার সিনড্রোম আক্রান্ত শিশুদের অস্বাভাবিকতা সেভাবে ধরা পড়ে না। তারা বরং অমনোযোগী, অমিশুক প্রকৃতির, মেধাহীন বা স্বল্প বুদ্ধির ব্যাকবেঞ্চার হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে পড়ে।

এ বয়সী অটিস্টিক শিশুদের আরও কয়েকটি সাধারণ আচরণের কথা বলা যেতে পারে, যেগুলো অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।

* হাত নেড়ে টা-টা দেয়ার সময় অনেকে হাতের তালু নিজের দিকে মুখ করিয়ে রাখে। কারণ অন্যদের টাটা দেখার সময় সে দেখে যে হাতের তালুটা তার দিকে মুখ করা।

*কিছু দেখার সময় হঠাৎ হঠাৎ বস্তুটি চোখের একেবারে কাছে এনে দেখে যা দেখে মনে হতে পারে তার দৃষ্টিশক্তিতে কোন সমস্যা আছে অথবা সে খুব ক্ষুদ্র কিছু নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করার চেষ্টা করছে।

* অন্য কাউকে ছবি, বই, বা কার্ডজাতীয় কিছু দেখাতে হলে সে ছবিটা তার নিজের দিকে ফিরিয়ে রাখবে, আর উল্টো পিঠটা দেখাবে।

* কয়েকজনকে কিছু খেতে দেয়া হয়েছে; খাওয়া শেষে একটা টিস্যু পেপারের বাক্স এক এক করে সবার কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যার সামনে দেয়া হচ্ছে সে একটা করে টিস্যুপেপার টেনে নিচ্ছে, হাত মুছছে। এদের মধ্যে একজন অটিস্টিক শিশু থাকলে তার জন্য সাধারণ আচরণ হবে একটা টিস্যু টেনে না নিয়ে বাক্সটিই নিয়ে নিতে চাওয়া।

* কারো সঙ্গে দেখা হলো বা বাড়ীতে কেউ এলো, শিশুকে তখন কিছু সাধারণ সহবত শেখানো হয়, যেমন সালাম/আদাব দেয়া বা উইশ করা। অটিস্টিক শিশুর জন্য এই সামান্য কাজটিই অত্যন্ত কঠিন। কারণটি বিস্তৃত করা যাক। এক্ষেত্রে ১.মানুষটিকে চেনা, ২.নাম/পরিচিতিসূত্র মনে করা, ৩.মুখ খুলে কথা বলা আর ৪.পূর্বোক্ত তিনটি কাজ করার সময় মানুষটির সঙ্গে আই-কন্ট্যাক্ট বজায় রাখা– এই চারটি কাজ একসঙ্গে করার মতো চাপ তার স্নায়ু নিতে পারেনা। তাই দেখা যায়, পরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলেও সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে বা মুখ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বারবার বলার পর বা জোর করা হলে হয়তো কোনমতে এক ঝলক চোখাচোখি করেছে তো সঙ্গেসঙ্গে কথা জড়িয়ে ফেলেছে।

* তাকে বিশেষ কোন জায়গায়, যেমন মার্কেটে বা স্কুলে নিয়ে যাওয়া হবে, সেটা সে জানে। রেডি হয়ে দরজা খুলে দেখা গেল একটা পাখী বসে আছে বা খবরের কাগজ এসেছে। বাবা বা মা হয়তো সেটা নিয়ে কোন কথা বললেন। দেখা যাবে, পরবর্তীতে যখনই স্কুলে বা মার্কেটে যাবার কথা আসবে বা তাকে সেখানে যাবার জন্য রেডি করানো হবে, সে বলে উঠবে “পাখী এসেছে” বা “পেপার দিয়েছে” যদিও তার কোনটিই ঘটেনি। আগেরবারের ঘটনাটি তার মাথায় গেঁথে গেছে; সে যেটার পুনরাবৃত্তি করে চলেছে। এই ব্যাপারটা একই সময়ে ঘটে যাওয়া যে কোন ধরণের একাধিক কাজ/ঘটনার ক্ষেত্রে ঘটতে পারে।

||৫||

অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসা

এখানে প্রথমেই আসে শিশুর অটিজম শনাক্তকরণের বিষয়টি। ৩য় অধ্যায়ে বর্ণিত লক্ষণগুলোর মধ্যে যে কোন কোনটি সাময়িক সময়ের জন্য স্বাভাবিক শিশুদের মধ্যেও থাকতে পারে। তাই একটি লক্ষণ দেখেই বাবা মায়েদের তাদের শিশুটিকে অটিস্টিক ভেবে নেয়া ঠিক হবেনা। আর একজন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে যে সবগুলো লক্ষণই একসঙ্গে থাকবে তাও নয়। আবার বাবা মায়েদের এটাও খেয়াল রাখতে হবে; এ ধরণের কয়েকটি লক্ষণ সন্তানের মধ্যে বেশি দিন ধরে দেখা যাচ্ছে কিনা। যদি তা হয় তবে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপণ্ণ হতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুকে সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ করে দিতে হবে। তখন একই বয়সী অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা করে বাচ্চার যেকোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে দেরী না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকদের মতে, নীচের সমস্যগুলো শিশুর মধ্যে দেখা গেলে অবিলম্বে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন:
* শিশু যদি ১ বছরের ভেতর মুখে অনেক আওয়াজ (Babbling) না করে, কিংবা আঙ্গুল দিয়ে বা অঙ্গভঙ্গি করে কোন কিছু না দেখায়।
* ১৬ মাসের ভিতর যদি এক শব্দের বাক্য না বলে।
* ২ বছরের ভিতর যদি দুই শব্দের সংমিশ্রণে বাক্য না বলে।
* একটি শিশুর কথা ও সামাজিক আচরণ যদি হঠাৎ হারিয়ে যায়।

অটিস্টিক শিশুর চিকিৎসা সাধারণত তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে দেয়া হয়।
১. অস্বাভাবিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য শিশুর বাবা মা এবং/অথবা অনুরূপ অভিভাবককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান। সময় ও যত্নসাপেক্ষ চর্চায় তারা বাড়িতে শিশুর আচরণগত পরিবর্তন আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। এই কাজটি সফলভাবে করা সম্ভব হলে পরিবার ও সমাজে ভবিষ্যতে শিশুটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্পিচ থেরাপিস্ট ও মনোবিদের পরামর্শ জরুরী।
২. বিশেষায়িত স্কুলের মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুকে একদিকে যেমন প্রথাগত শিক্ষা প্রদান এবং ভবিষ্যতে তার জন্য উপযোগী কোনো পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৩. প্রয়োজন ও রোগলক্ষণ অনুযায়ী কিছু ঔষধ ও সাইকোথেরাপি। অবশ্যই সেটা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হতে হবে।

এমন অবস্থা কতদিন চলবে?
অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে যাদের ইনটেলেকচুয়াল ডিজেবিলিটি নেই, অর্থাৎ অ্যাসপারগার সিনড্রোমে ভুগছে এমন শিশুদের অনেকে নিবিড় যত্ন ও পরিচর্যায় চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো একটু একটু করে কমিয়ে আনতে পারে, এবং কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও একসময় সাধারণ স্কুলে স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়ালেখা করতে পারে। আরো ১০-২০% শিশু স্বাভাবিক শিশুদের সাথে পড়তে পারে না, তারা বাসায় থাকে বা তাদের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষায়িত স্কুল ও বিশেষ প্রশিক্ষণের। বিশেষায়িত স্কুলে পড়ে, ভাষা সহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ গ্রহন করে তাদের পক্ষে সমাজে মোটামুটি স্বনির্ভর একটা স্থান করে নেয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বাদবাকি প্রায় ৬০% অটিস্টিক শিশু, সব ধরণের সহায়তা পাওয়ার পরও স্বাধীন, স্বনির্ভর ও এককভাবে জীবন অতিবাহিত করতে পারে না। তাদের নিয়তি বা বাস্তবতা হলো দীর্ঘ দিনের– এমনকি সারা জীবনের জন্য অন্যের উপর নির্ভরতা। পরিবারে অথবা বিশেষ আবাসনে, বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রয়োজন হয় তাদের।

===========================================

প্রকাশিত গ্রন্থ “শিশুর অটিজম: তথ্য ও ব্যবহারিক সহায়তা”র প্রথম অধ্যায় থেকে সংকলিত ও সংক্ষেপিত।

লিখেছেনঃ নুশেরা